বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) একটি স্বেচ্ছাসেবী আধা-সামরিক বাহিনী, যা দেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রশিক্ষণ প্রদান করে। বিএনসিসি-র সাংগঠনিক কাঠামো অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং এখানে ক্যাডেটদের দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি প্রদান করা হয়। পদোন্নতি পরীক্ষা সাধারণত লিখিত ও ব্যবহারিক উভয় অংশে বিভক্ত থাকে। এই পোস্টটিতে বিগত বছরগুলোর প্রশ্নের আলোকে এবং ২০১৬ সালের পদোন্নতি পরীক্ষার সিলেবাস অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তরগুলো সংকলন করা হয়েছে।
বিশেষ ঘোষণা:
আগামী ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে কর্ণফুলী রেজিমেন্ট ক্যাডেট পদোন্নতি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এই পোস্টটি ক্যাডেটদের চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে।
পদোন্নতির ধাপসমূহ:
ক্যাডেটদের পদোন্নতি সাধারণত নিচের ধাপগুলোতে হয়ে থাকে:
১. ক্যাডেট হতে ক্যাডেট ল্যান্স কর্পোরাল
২. ক্যাডেট ল্যান্স কর্পোরাল হতে ক্যাডেট কর্পোরাল
৩. ক্যাডেট কর্পোরাল হতে ক্যাডেট সার্জেন্ট
📝 বিভাগ ১: সাধারণ জ্ঞান (General Knowledge)
এই বিভাগে ক্যাডেটদের বিএনসিসি এবং জাতীয় সামরিক বিষয়গুলো যাচাই করা হয়।
১. বিএনসিসি (BNCC) কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে?
উত্তরঃ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
২. বিএনসিসি (BNCC)-র মূলমন্ত্র কয়টি?
উত্তরঃ ৩ টি।
৩. বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর সেনা শাখায় সর্বমোট কতটি ব্যাটালিয়ন আছে?
উত্তরঃ ২৫ টি।
৪. সশস্ত্র বাহিনী দিবস কবে পালিত হয়?
উত্তরঃ ২১শে নভেম্বর।
৫. ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম কত নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল?
উত্তরঃ ১ নং সেক্টরের অধীনে।
৬. দূর্যোগ কত প্রকার ও কি কি?
উত্তরঃ দুর্যোগ ০২ প্রকার। (ক) মানবসৃষ্ট এবং (খ) প্রাকৃতিক।
৭. BMA এবং GPA এর পূর্ণরূপ কি?
উত্তরঃ BMA: Bangladesh Military Academy, এবং GPA: Grade Point Average।
৮. বর্তমান মহাপরিচালক এবং কর্ণফুলী রেজিমেন্ট কমান্ডারের নাম কি?
উত্তরঃ মহাপরিচালক: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু সঈদ আল মসউদ; (সব সময় বর্তমান DG এর নাম উল্লেখ করবে)
রেজিমেন্ট কমান্ডার: লেঃ কর্ণেল সাদিক । ( সব সময় বর্তমান RC এর নাম উল্লেখ করবে)
৯. ব্যাটালিয়ন এ্যাডজুটেন্ট এর নাম কি?
উত্তরঃ মেজর মোঃ রফিকুল হাসান রাফি, পদাতিক।
১০. তুমি কত ব্যাটালিয়নের কোন কোম্পানীর ক্যাডেট?
উত্তরঃ (এখানে ক্যাডেট তার নিজ ব্যাটালিয়ন ও কোম্পানীর নাম উল্লেখ করবে)।
📝 বিভাগ ২: ফিল্ডক্র্যাফট ও রণকৌশল (Fieldcraft & Tactics)
এই বিভাগে ক্যাডেটদের সামরিক জ্ঞান এবং কৌশলগত বিষয়গুলো যাচাই করা হয়।
১. সঠিক দূরত্ব নির্ণয়ের পদ্ধতি কয়টি ও কি কি?
উত্তরঃ সঠিক দূরত্ব নির্ণয়ের পদ্ধতি ৫টি। যথা:
(ক) একক মাত্রা পদ্ধতি,
(খ) আকৃতি পদ্ধতি,
(গ) দৃষ্টি পরিবর্তন পদ্ধতি,
(ঘ) ফ্রন্ট সাইট টিপ পদ্ধতি, এবং
(ঙ) শব্দের দ্বারা দূরত্ব নির্ণয় পদ্ধতি।
২. জটিল পদ্ধতিতে লক্ষ্যবস্তু দেখানোর পদ্ধতি কয়টি ও কি কি?
উত্তরঃ ৫টি। যথা:
(ক) সাহায্যকারী চিহ্ন,
(খ) ঘড়ির সাহায্য,
(গ) ডিগ্রীর সাহায্যে (হাতের আঙ্গুলের সাহায্যে),
(ঘ) ট্রেসার ফায়ারের সাহায্যে, এবং
(ঙ) পয়েন্টার স্টাফের সাহায্যে।
৩. ছদ্মবেশ ও গোপনীয়তার (Camouflage and Secrecy) নীতিমালা কয়টি ও কি কি?
উত্তরঃ ছদ্মবেশ ও গোপনীয়তার নীতিমালা ০২ টি।
(ক) আকৃতিকে বিকৃতি করা এবং
(খ) উজ্জ্বলতাকে ধ্বংস করা।
৪. চাল কত প্রকার ও কি কি?
উত্তরঃ সামরিক ভাষায় চাল ০৪ প্রকার। যথা:
(ক) গড়ানো চাল,
(খ) চিতা চাল,
(গ) হাঁটা চাল, এবং
(ঘ) বানর চাল।
৫. দিক নির্ণয়ের উপাদানগুলো কি কি?
উত্তরঃ দিক নির্ণয় করার প্রধান ৫টি উপায় হলো:
(ক) সূর্যের সাহায্যে,
(খ) মসজিদের সাহায্যে,
(গ) মুসলমানদের কবরের সাহায্যে,
(ঘ) কম্পাসের সাহায্যে, এবং
(ঙ) ধ্রুব তারার সাহায্যে।
৬. হাতের আঙ্গুলের সাহায্যে ডিগ্রী নির্ণয়:
- তর্জনী আঙ্গুল হতে কনিষ্ঠ আঙ্গুল পর্যন্ত: ৮ ডিগ্রী
- তর্জনী আঙ্গুল হতে মধ্যমা আঙ্গুল পর্যন্ত: ৩ ডিগ্রী
- মধ্যমা আঙ্গুল হতে কনিষ্ঠ আঙ্গুল পর্যন্ত: ৫ ডিগ্রী
৭. টহল কাকে বলে, টহল কত প্রকার ও কি কি? কয়টি পর্বে সমাধান করা যায়?
উত্তরঃ
টহল (Patrol): শত্রুর এলাকায় চুপি চুপি প্রবেশ করে গোপনভাবে কিংবা সরাসরি সংঘর্ষের মাধ্যমে শত্রুর সংবাদ সংগ্রহ করা অথবা নিজ বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অধিনায়ককে সঠিকভাবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরীতে সাহায্য করাকে টহল বা Patrol বলে।
টহলের প্রকারভেদ: টহল প্রধানত ২ প্রকার। যথা:
১. জঙ্গী টহল (Fighting Patrol)
২. পর্যবেক্ষণ টহল (Reconnaissance Patrol/Recce Patrol)
টহলের পর্ব (Phases of Patrol): একটি টহল মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য মূলত ৩টি পর্বে কাজ করা হয়:
১. প্রস্তুতি পর্ব (Preparation Phase)
২. কার্যকর বা টহল পরিচালনা পর্ব (Conduct Phase)
৩. প্রতিবেদন বা ডিব্রিফিং পর্ব (Reporting/Debriefing Phase)
৮. হানা (Raid) কাকে বলে? হানার পর্ব কয়টি এবং দল কয়টি ও কি কি?
উত্তরঃ শত্রু বাহিনীর শক্তি বা মনোবল খর্ব করার লক্ষ্যে, নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে হঠাৎ কোনো স্থানে আক্রমণ করা এবং কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই পরিকল্পিতভাবে সেই স্থান ত্যাগ করাকেই হানা বা Raid বলা হয়। এটি মূলত একটি সাময়িক আক্রমণ, যেখানে এলাকা দখল করে রাখা মূল উদ্দেশ্য থাকে না।
হানার পর্ব: একটি সফল হানা সম্পন্ন করতে মূলত ৩টি পর্ব বা পর্যায় অতিক্রম করতে হয়:
১. যাত্রা বা অগ্রসর হওয়া (Approach)
২. আক্রমণ বা হানা প্রদান (Action at the Objective)
৩. প্রত্যাবর্তন বা পিছু হটা (Withdrawal)
হানার দল: হানার দল ০৫টি। যথা:
১. বিচ্ছিন্নকারী দল (Isolation Party/Cut-off Party)
২. আবরনী দল (Covering Party)
৩. বাঁধা প্রদানকারী দল (Check/Stop Party)
৪. কার্যকরী দল (Assault Party)
৫. সংরক্ষিত দল (Reserve Party)
বিশেষ দ্রষ্টব্য: হানার সময় উপ-অধিনায়ক (Second-in-Command) সাধারণত কাভারিং পার্টি বা আবরনী দলের সাথে অবস্থান করেন।
৯. ফাঁদ (Ambush) কাকে বলে? এর প্রকারভেদ এবং দল কয়টি ও কি কি?
উত্তরঃ
ফাঁদ বা অ্যাম্বুশ (Ambush): শত্রু বাহিনীকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দেওয়ার জন্য কোনো গোপন স্থানে ওত পেতে থেকে হঠাৎ আক্রমণ করাকে ফাঁদ বা Ambush বলা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো শত্রুকে ধ্বংস করা, বন্দী করা অথবা তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া। অ্যাম্বুশে এলাকা দখল করার কোনো উদ্দেশ্য থাকে না, বরং অতর্কিত হামলা চালিয়ে শত্রুর ক্ষতি করাই প্রধান লক্ষ্য।
অ্যাম্বুশ বা ফাঁদের প্রকারভেদ:
অ্যাম্বুশ প্রধানত ০২ প্রকার। যথা:
১. তাৎক্ষণিক বা আকস্মিক ফাঁদ (Immediate/Chance Ambush)
২. পরিকল্পিত ফাঁদ (Deliberate Ambush)
অ্যাম্বুশ বা ফাঁদের দল (Ambush Parties):
একটি সফল অ্যাম্বুশ পরিচালনার জন্য মূল বাহিনীকে সাধারণত ০৪টি দলে ভাগ করা হয়:
১. বিচ্ছিন্নকারী দল (Isolation Party)
২. আবরনী দল (Covering Party)
৩. কার্যকরী দল (Assault Party)
৪. সংরক্ষিত দল (Reserve Party)
১০. রাত্রিকালীন মার্চের সংগঠন লিখ।
উত্তরঃ রাত্রিকালীন মার্চের সংগঠন ০৩ জন।
(ক) পথ প্রদর্শক,
(খ) সহকারী পথ প্রদর্শক, এবং
(গ) গনণাকারী।
১১. চূড়ান্ত মিলনস্থান (FRV)-এ মূল দল কত দূরে অবস্থান করবে?
উত্তরঃ চূড়ান্ত মিলনস্থানে পৌঁছার পূর্বে মূল দল ৩০০ মিটার দূরে অবস্থান করবে।
১২. ফায়ার নিয়ন্ত্রন আদেশ কয় প্রকার ও কি কি?
উত্তরঃ ফায়ার নিয়ন্ত্রন আদেশ ৪ প্রকার। যথা:
(ক) ব্যক্তিগত ফায়ার নিয়ন্ত্রন আদেশ,
(খ) অপেক্ষামান ফায়ার নিয়ন্ত্রন আদেশ,
(গ) সংক্ষিপ্ত ফায়ার নিয়ন্ত্রন আদেশ, এবং
(ঘ) সম্পূর্ণ ফায়ার নিয়ন্ত্রন আদেশ।
১৩. মানচিত্রে পাকা রাস্তা বুঝানোর জন্য কোন ধরনের রং ব্যবহার করা হয়?
উত্তরঃ লাল রং।
১৪. একটি মরিচায় (Trench) কয়টি রেঞ্জ কার্ড প্রস্তুত করতে হয়?
উত্তরঃ ২টি।
📝 বিভাগ ৩: অস্ত্র পরিচিতি (Weapon Knowledge)
এই বিভাগে ক্যাডেটদের সামরিক অস্ত্র এবং তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো যাচাই করা হয়।
১. ৭.৬২ মিঃ মিঃ রাইফেল টাইপ- ৫৬ (চায়না) এর বৈশিষ্ট্য কয়টি ও কি কি?
উত্তরঃ এই রাইফেলের প্রধান ৬টি বৈশিষ্ট্য হলো:
(ক) আধা স্বয়ংক্রিয়,
(খ) গ্যাসের সাহায্যে পরিচালিত,
(গ) বাতাসের দ্বারা ঠান্ডা হয়,
(ঘ) ম্যাগাজিন হতে গলি ফিড করা হয়,
(ঙ) বেয়নেট লাগানো যায়,
(চ) অন্যান্য রাইফেল হতে হালকা এবং কার্যকরী ফায়ার করা যায়।
২. ৭.৬২ মিঃ মিঃ রাইফেল টাইপ- ৫৬ (চায়না) সাধারণভাবে কতটি অংশে খোলা হয়?
উত্তরঃ ৮ অংশে।
📝 বিভাগ ৪: প্রাথমিক চিকিৎসা (First Aid)
এই বিভাগে ক্যাডেটদের প্রাথমিক চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়গুলো যাচাই করা হয়।
১. হিটস্ট্রোক এর লক্ষণ গুলো কি কি?
উত্তরঃ হিটস্ট্রোকের লক্ষণসমূহ হলো:
(ক) শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া,
(খ) ঘাম কমে যাওয়া বা একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া,
(গ) ত্বক লাল ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া,
(ঘ) শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা,
(ঙ) শরীরে ক্লান্তিভাব, মাথাব্যথা এবং বমি বমি ভাব, এবং
(চ) পালস দ্রুত হওয়া এবং হার্টবিট বেড়ে যাওয়া।
২. হৃদরোগের লক্ষণ সমূহ কি কি?
উত্তরঃ হৃদরোগের লক্ষণসমূহ হলো:
(ক) বুকে ব্যাথা বা অস্বস্তি,
(খ) শ্বাসকষ্ট,
(গ) অতিরিক্ত ঘাম,
(ঘ) বাহু, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ব্যাথা, এবং
(ঙ) মাথা ঘোরানো বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
🎯 নিজেকে যাচাই করুন: অনুশীলন বিভাগ
১. “বিএনসিসি প্রশিক্ষণ ক্যাডেটদের ক্যারিয়ার গঠনে সহায়তা করে”— সপক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি দাও।
২. সামরিক কৌশলগত জ্ঞানে ছদ্মবেশ ও গোপনীয়তার গুরুত্ব আলোচনা করুন।
৩. আপনার ইউনিটের ক্যাডেটদের মধ্যে সঠিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে আপনি কী কী পদক্ষেপ নেবেন?
৪. ‘হিটস্ট্রোক’ এবং ‘হৃদরোগ’—এর মধ্যে পার্থক্য কী? লক্ষণগুলোর তুলনা করুন।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত ও সম্পাদিত: ক্যাপ্টেন মুহম্মদ জিয়াউর রহমান, বিএনসিসি অফিসার। Link: https://bncc.work (এটি bncc.work এর একটি বিশেষ আর্কাইভাল পোস্ট। অনুমতি ব্যতীত এর কোনো অংশ পুন:প্রকাশ নিষিদ্ধ।)
About The Author
Discover more from BNCC Resource Hub
Subscribe to get the latest posts sent to your email.