সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজের তৃতীয় পর্বে আমরা তুলে ধরছি প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (National Cadet Corps, NCC) ও এর সাথে সম্পর্কিত জাতীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা। উল্লেখ্য, ভারত ও বাংলাদেশের বিপরীতে পাকিস্তানের এই ক্যাডেট ব্যবস্থাটি বর্তমানে বিলুপ্ত — তাই এই পর্বটি মূলত একটি ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পর্যালোচনা।
ভূমিকা ও ঐতিহাসিক পটভূমি
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা University Officers’ Training Corps (UOTC) ও Army Cadet Force-এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর নবগঠিত পাকিস্তানও ছাত্রদের সামরিক ধাঁচের প্রশিক্ষণের একটি কাঠামো গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়। ১৯৪৭ সালে একটি সরকারি কমিটি এর প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করে এবং প্রায় ১৯৪৮ সালের দিকে ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর যাত্রা শুরু করে; ১৯৫০ সালের সেপ্টেম্বরে এটি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। ব্রিটেনের Officers’ Training Corps ও Army Cadet Force-এর আদলে গড়ে তোলা এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল কলেজ পর্যায়ের ছাত্রদের নেতৃত্ব ও প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া।
প্রাথমিক পর্যায়ে NCC মূলত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে কার্যক্রম চালাত। ১৯৫২ সালের দিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও (বর্তমান বাংলাদেশ) এটি সম্প্রসারণের কথা বিবেচিত হয়েছিল, তবে তা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছিল তা নিয়ে তথ্য সীমিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের NCC-কে ন্যাশনাল গার্ড (National Guard)-এর সাথে একীভূত করা হয়।
সাংগঠনিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ
পাকিস্তানের NCC কোনো স্বতন্ত্র বেসামরিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে না থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে, রিজার্ভ বাহিনী ন্যাশনাল গার্ডের একটি অঙ্গ হিসেবে পরিচালিত হতো। ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল গার্ড ছিল সেনাবাহিনীর একটি "দ্বিতীয় সারির প্রতিরক্ষা" (second line of defence) কাঠামো, যা সেনাপ্রধানের (Chief of Army Staff) অধীনে GHQ, রাওয়ালপিন্ডি থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো।
এই কাঠামোতে কলেজভিত্তিক ব্যাটালিয়ন গঠন করা হতো, যেখানে ছাত্ররা ক্যাডেট এবং কলেজের শিক্ষক/কর্মকর্তারা অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। ১৯৬০ সালের একটি কমিশন সংগঠনটিকে আরও সুসংগঠিত করতে সেনাবাহিনীর অধীনে একটি পৃথক ডিরেক্টরেট গঠনের সুপারিশ করেছিল। বর্তমানে ন্যাশনাল গার্ডের সক্রিয় অঙ্গ হলো মুজাহিদ ফোর্স (Mujahid Force) ও জানবাজ ফোর্স (Janbaz Force); NCC ও পূর্বতন উইমেন’স ন্যাশনাল গার্ড আর সক্রিয় নেই।
লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মূলমন্ত্র
NCC-এর মূল লক্ষ্য ছিল কলেজ ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের তরুণদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম ও প্রাথমিক সামরিক দক্ষতা গড়ে তোলা এবং জরুরি প্রয়োজনে একটি প্রশিক্ষিত রিজার্ভ জনশক্তি তৈরি করা। কলেজ ব্যাটালিয়নের মাধ্যমে ছাত্রদের সামরিক ধাঁচের প্রশিক্ষণ দেওয়াই ছিল এর কেন্দ্রীয় ভাবনা।
সততার সাথে উল্লেখ্য: ভারত ও বাংলাদেশের ক্যাডেট কোরের মতো পাকিস্তানের NCC-এর একটি সুনির্দিষ্ট, ব্যাপকভাবে প্রচারিত "মূলমন্ত্র" (motto) সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য উন্মুক্ত তথ্য সীমিত। তাই এখানে কোনো নির্দিষ্ট মূলমন্ত্র দাবি করা হচ্ছে না — এ বিষয়ে যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে হালনাগাদ করা হবে।
ক্যাডেট সংখ্যা ও বিস্তৃতি
সংগঠনটির সম্প্রসারণের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ১৯৬০ সালের মধ্যে প্রায় ২০,০০০ সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৭ সাল নাগাদ পাকিস্তানের অধিকাংশ ডিগ্রি কলেজে NCC কার্যক্রম চালু ছিল বলে জানা যায়। তবে বিভিন্ন সময়ের সঠিক সদস্য-সংখ্যা নিয়ে বিস্তারিত ও হালনাগাদ পরিসংখ্যান উন্মুক্ত উৎসে সীমিত; তাই এখানে অনুমাননির্ভর কোনো সংখ্যা দেওয়া হলো না।
প্রশিক্ষণ, ক্যাম্প ও কার্যক্রম
NCC-এর প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত ছিল বার্ষিক সামরিক ধাঁচের ক্যাম্প, ড্রিল ও প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ। ১৯৭৩ সালের ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী সুস্থ-সবল পুরুষ কলেজ-ছাত্র ও কলেজ-কর্মকর্তারা এতে যুক্ত হতে পারতেন এবং সদস্য হিসেবে তাঁরা সামরিক আইনের (military law) আওতাভুক্ত থাকতেন। কলেজ ব্যাটালিয়নভিত্তিক কাঠামোয় শৃঙ্খলা, শারীরিক সক্ষমতা ও নেতৃত্ব বিকাশই ছিল কার্যক্রমের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
র্যাঙ্ক, সার্টিফিকেট ও সুযোগ-সুবিধা
NCC সম্পন্নকারীদের জন্য উল্লেখযোগ্য একটি সুবিধা ছিল সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকারমূলক বিবেচনা। তবে ভারতের NCC-এর ‘A/B/C’ সার্টিফিকেট ব্যবস্থা কিংবা বাংলাদেশের বিএনসিসির নির্দিষ্ট পদোন্নতি ও সার্টিফিকেট কাঠামোর মতো পাকিস্তানের NCC-এর র্যাঙ্ক ও সার্টিফিকেট ব্যবস্থার বিস্তারিত ও যাচাইযোগ্য বিবরণ উন্মুক্ত উৎসে সহজলভ্য নয়। এই বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য এড়াতে আমরা এখানে কোনো নির্দিষ্ট সার্টিফিকেট-স্তর দাবি করছি না।
বর্তমান অবস্থা: বিলুপ্তি ও পুনঃপ্রবর্তনের আলোচনা
পাকিস্তানের NCC ২০০২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের সময় বিলুপ্ত করা হয়। এরপর ২০১৪ সালে পেশোয়ারের স্কুলে সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে সংগঠনটি পুনরায় চালুর কথা বিবেচিত হয়। ২০১৫ সালে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এবং ২০১৯ সালে প্রাদেশিক পর্যায়ে NCC পুনঃপ্রবর্তনের দাবি ও আলোচনা উঠলেও, দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গভাবে এটি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে — এমন নিশ্চিত তথ্য এখনো নেই।
বিভ্রান্তি এড়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য: পাকিস্তানের বহুল পরিচিত "ক্যাডেট কলেজ" (Cadet Colleges) — যেমন হাসান আবদাল, পেটারো, ঘোটকি ইত্যাদি — এই NCC থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ক্যাডেট কলেজগুলো হলো আবাসিক সামরিক-ধাঁচের মাধ্যমিক/উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর NCC ছিল সাধারণ কলেজ-ছাত্রদের জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবী সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। দুটিকে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
বিএনসিসির সাথে তুলনা
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান — উভয় দেশের ক্যাডেট ব্যবস্থারই শিকড় প্রোথিত অভিন্ন ব্রিটিশ-ভারতীয় UOTC ঐতিহ্যে। কিন্তু স্বাধীনতার পর দুই দেশের পথ ভিন্ন হয়ে যায়:
| বিষয় | পাকিস্তান NCC | বাংলাদেশ বিএনসিসি |
|---|---|---|
| বর্তমান অবস্থা | বিলুপ্ত (২০০২) | সক্রিয় ও ক্রমবর্ধমান |
| নিয়ন্ত্রণ | সেনাবাহিনী / ন্যাশনাল গার্ড | প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় |
| স্তর | মূলত কলেজ পর্যায় | স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় |
| শাখা | মূলত সেনা-ধাঁচ (স্থল) | ত্রি-বাহিনী: সেনা, নৌ ও বিমান |
| নারী অন্তর্ভুক্তি | সীমিত (পুরুষকেন্দ্রিক নীতিমালা) | পুরুষ ও নারী উভয় প্লাটুন |
| মূলমন্ত্র | সুনির্দিষ্ট তথ্য সীমিত | "জ্ঞান ও শৃঙ্খলা" |
এই তুলনা থেকে স্পষ্ট, বাংলাদেশ যেখানে বিএনসিসিকে একটি সক্রিয়, ত্রি-বাহিনীভিত্তিক ও ক্রমবর্ধমান স্বেচ্ছাসেবী রিজার্ভ সংগঠন হিসেবে ধারাবাহিকভাবে বিকশিত করেছে, সেখানে পাকিস্তানে এই ধারার প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্র-ক্যাডেট ব্যবস্থাটি কার্যত থেমে গেছে। আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বিএনসিসির ধারাবাহিকতা ও সম্প্রসারণ তাই একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
তথ্যসূত্র
- National Cadet Corps (Pakistan) — Wikipedia
- National Guard (Pakistan) — Wikipedia
- Bangladesh National Cadet Corps — Wikipedia
- Cadet College — Wikipedia (পাকিস্তানের ক্যাডেট কলেজ প্রসঙ্গ)
দ্রষ্টব্য: পাকিস্তানের NCC বর্তমানে বিলুপ্ত থাকায় সরকারি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট-ভিত্তিক হালনাগাদ তথ্য সীমিত। তাই কিছু ক্ষেত্রে (যেমন মূলমন্ত্র, সার্টিফিকেট-স্তর ও সাম্প্রতিক সদস্য-সংখ্যা) সততার সাথে অনিশ্চয়তা উল্লেখ করা হয়েছে; বানানো বা অনুমাননির্ভর তথ্য পরিহার করা হয়েছে।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত ও সম্পাদিত: ক্যাপ্টেন মুহম্মদ জিয়াউর রহমান, বিএনসিসি অফিসার। — https://bncc.work





You must be logged in to post a comment.