সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজের আগের তিনটি পর্বে আমরা দেখেছি সার্কভুক্ত দেশগুলোর সামগ্রিক পরিচিতি, ভারতের বিশাল National Cadet Corps (NCC) এবং পাকিস্তানের NCC-এর ইতিহাস। এই চতুর্থ পর্বে আলোচনা করব দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীনতম ক্যাডেট সংগঠন—শ্রীলঙ্কার ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (National Cadet Corps, NCC) নিয়ে। ১৮৮১ সাল থেকে চলে আসা এই সংগঠনটিকে শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ইউনিফর্মধারী যুব-উন্নয়ন সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে।
১. ভূমিকা ও ঐতিহাসিক পটভূমি
শ্রীলঙ্কায় ক্যাডেট প্রশিক্ষণের সূচনা হয় ১৮৮১ সালে, কলম্বোর ঐতিহ্যবাহী রয়্যাল কলেজ (Royal College, Colombo)-এ। তৎকালীন অধ্যক্ষ জন বি. কাল (John B. Cull)-এর উদ্যোগে “ড্রিলের মাধ্যমে শৃঙ্খলা গড়ে তোলার” লক্ষ্যে এই কার্যক্রম শুরু হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে এটি সিলন লাইট ইনফ্যান্ট্রির (Ceylon Light Infantry) সঙ্গে যুক্ত ক্যাডেট ব্যাটালিয়ন হিসেবে পরিচালিত হতো।
দীর্ঘ পথচলায় সংগঠনটির নাম ও কাঠামো কয়েকবার পরিবর্তিত হয়েছে:
- Ceylon Cadet Battalion — ব্রিটিশ আমলে ক্যাডেট ব্যাটালিয়ন গঠন (১৯১৯ নাগাদ কাঠামোবদ্ধ)।
- Ceylon Cadet Corps (CCC) — ১৯৫০ সালে সিলন সেনাবাহিনীর (Ceylon Army) অধীনে পুনর্গঠন।
- Sri Lanka Cadet Corps (SLCC) — ১৯৭২ সালে শ্রীলঙ্কা প্রজাতন্ত্র ঘোষণার পর নামকরণ।
- National Cadet Corps (NCC) — ১৯৮৮ সালের ২৯ এপ্রিল পুলিশ ক্যাডেটিং-এর সঙ্গে একীভূত হয়ে বর্তমান “ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর” গঠিত হয়। ১৯৮৯ সাল থেকে এটি সরাসরি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আসে।
ঐতিহাসিকভাবে শ্রীলঙ্কার ক্যাডেটরা যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ৩৩০ জন ক্যাডেট স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেন; তাঁদের একজন লেফটেন্যান্ট আর্থার ব্যাসিল হর্সফল (Arthur Basil Horsfall) মরণোত্তর ভিক্টোরিয়া ক্রস (Victoria Cross) লাভ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৭১ সালের বিদ্রোহ এবং পরবর্তী গৃহযুদ্ধেও (১৯৮৩–২০০৯) সংগঠনের সাবেক সদস্য ও অফিসারদের অনেকে সশস্ত্র বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২. সাংগঠনিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়
শ্রীলঙ্কা NCC পরিচালিত হয় দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (Ministry of Defence) অধীনে। এটি মূলত একটি স্বেচ্ছাসেবী স্কুলভিত্তিক ইউনিফর্মধারী যুব সংগঠন, যা শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ-ঐতিহ্য অনুসরণ করে পরিচালিত হয়।
- সদর দপ্তর: ১৫ নং, দুতুগেমুনু স্ট্রিট, পামানকাডা, দেহিওয়ালা (Dehiwala), কলম্বো অঞ্চল।
- প্রশাসনিক বিস্তৃতি: দেশজুড়ে ৯টি প্রাদেশিক সদর দপ্তর (Provincial Headquarters), একাধিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং ৩০-এর বেশি ব্যাটালিয়ন।
- নেতৃত্ব: ১৯৮৮ সালে প্রথম NCC পরিচালক ছিলেন মেজর জেনারেল ই. জি. থেবানায়াগম (EG Thevanayagam)। সাম্প্রতিক সময়ে (২০২৫) পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল এপিসিআর প্রেমাথিলাকা (APCR Premathilaka)।
সংগঠনটি মূলত ডিফেন্স (Defence) ও পুলিশ (Police) প্লাটুন—এই দুই ধারায় পরিচালিত হয়। ২০০৭ সালে নৌ ও বিমান শাখা (Naval & Air Force wings) চালু করা হলেও পরবর্তীতে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সেগুলো স্থগিত/পুনর্বিন্যস্ত করা হয় (প্রায় ২০২০)।
৩. লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মূলমন্ত্র
শ্রীলঙ্কা NCC-এর মূলমন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয় “Discipline through Drill” (ড্রিলের মাধ্যমে শৃঙ্খলা)—যা ১৮৮১ সালে এই সংগঠনের সূচনার মূল ভাবনাটিকেই ধারণ করে। সংগঠনের ঘোষিত উদ্দেশ্য হলো কার্যকর প্রশিক্ষণ কারিকুলামের মাধ্যমে প্রতিটি স্কুল ক্যাডেটকে প্রশিক্ষিত ও অনুপ্রাণিত করা।
এর মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম ও সুনাগরিকত্বের গুণাবলি গড়ে তোলা; শারীরিক সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি; এবং ভবিষ্যতে সশস্ত্র বাহিনীসহ জাতীয় সেবায় যোগদানের উপযোগী মানবসম্পদ তৈরি করা। ২০২৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে সংগঠনটিকে “President’s and Corps Colours” প্রদান করেন, যা জাতীয় স্বীকৃতির একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।
৪. ক্যাডেট সংখ্যা ও বিস্তৃতি
শ্রীলঙ্কা NCC দেশটির একটি বৃহৎ যুব সংগঠন। উন্মুক্ত সূত্রে সদস্য-সংখ্যার কিছুটা ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়—তাই একটি নির্দিষ্ট দাবি না করে এখানে পরিসর তুলে ধরা হলো (বানানো তথ্য পরিহার করে):
- ক্যাডেট সংখ্যা: আনুমানিক ৮৫,০০০ থেকে ১,০০,০০০+ (বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন অনুমান; প্রতি বছর প্রায় ৯০,০০০–৯৫,০০০ ক্যাডেট প্রশিক্ষিত হয় বলে উল্লেখ করা হয়)।
- অফিসার: ৩,০০০-এর বেশি।
- ব্যাটালিয়ন: মোটামুটি ২৯টি ছেলেদের ও ৯টি মেয়েদের ব্যাটালিয়ন (সব মিলিয়ে ৩০-৩৮টি, সূত্রভেদে)।
- প্লাটুন: সাড়ে চার হাজারের কাছাকাছি ক্যাডেট প্লাটুন (ডিফেন্স/পুলিশ ও ব্যান্ড মিলিয়ে)।
মেয়েদের ক্যাডেটিং শুরু হয় ১৯৮৫ সালে, এবং ২০১৪ সালের মধ্যে আলাদা মেয়েদের ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়—যা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
৫. প্রশিক্ষণ, ক্যাম্প ও কার্যক্রম
শ্রীলঙ্কা NCC-এর প্রশিক্ষণ কারিকুলাম মৌলিক সামরিক দক্ষতাকেন্দ্রিক। এর মধ্যে রয়েছে—শারীরিক সক্ষমতা (Physical Fitness), ফুট ড্রিল (Foot Drill), অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও ফায়ারিং (Weapon Training & Firing), ম্যাপ রিডিং (Map Reading), ফিল্ডক্রাফট (Field Craft) এবং প্রাথমিক চিকিৎসা (First Aid)। প্রশিক্ষণে T56 ধরনের অ্যাসল্ট রাইফেল ব্যবহার করা হয়।
প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও ক্যাম্প:
- রান্তম্বে প্রশিক্ষণকেন্দ্র (Rantambe) — ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত, প্রধান প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর একটি।
- মুলাইতিভু প্রশিক্ষণকেন্দ্র (Mullaitivu) — ২০২৪ সালের এপ্রিলে চালু হওয়া নতুন কেন্দ্র।
- দিয়াতালাওয়া (Diyatalawa) — ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্প অঞ্চল, বহু পুরোনো ক্যাডেট ক্যাম্পের স্থান।
- প্রতিবছর ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে মূল্যায়নমূলক বার্ষিক ক্যাম্প (Annual Assessment Camps) অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার: সেরা ছেলেদের প্লাটুনের জন্য হারমান লুস চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি (Hermann Loos Trophy)—যা ১৯১৭ সাল থেকে প্রদান করা হয়ে আসছে—এবং সেরা মেয়েদের প্লাটুনের জন্য ডি সোইসা চ্যালেঞ্জ ট্রফি (De Soysa Trophy) অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। এছাড়া আন্তঃপ্রাদেশিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও বার্ষিক শিবির সংগঠনের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ।
৬. র্যাঙ্ক, সার্টিফিকেট ও সুযোগ-সুবিধা
র্যাঙ্ক কাঠামো: শ্রীলঙ্কা NCC-এর র্যাঙ্ক ব্যবস্থা মূলত শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনীর প্যাটার্ন অনুসরণ করে। ক্যাডেট পর্যায়ে ধাপে ধাপে ল্যান্স কর্পোরাল, কর্পোরাল, সার্জেন্ট, স্টাফ সার্জেন্ট ও ওয়ারেন্ট অফিসার পর্যন্ত পদোন্নতি হয়; অফিসার পর্যায়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থেকে শুরু করে ক্যাপ্টেন, মেজর, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পর্যন্ত পদ রয়েছে।
সার্টিফিকেট: ভারত বা বাংলাদেশের মতো সুস্পষ্ট “A/B/C সার্টিফিকেট” স্তরভিত্তিক ব্যবস্থার তথ্য শ্রীলঙ্কা NCC সম্পর্কে উন্মুক্ত সূত্রে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না; বরং প্রশিক্ষণের অগ্রগতি মূলত বার্ষিক মূল্যায়ন ক্যাম্প ও দক্ষতা-ভিত্তিক পদোন্নতির মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়। (সততার স্বার্থে: নির্দিষ্ট সার্টিফিকেট-স্তর সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় এখানে কোনো দাবি করা হলো না।)
সুযোগ-সুবিধা: ঐতিহ্যগতভাবে NCC শ্রীলঙ্কার নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীতে অফিসার নিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত। শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও আত্মবিশ্বাস গঠনের পাশাপাশি জাতীয় অনুষ্ঠান, ক্রীড়া ও আন্তর্জাতিক যুব বিনিময় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়া যায়।
৭. বিএনসিসির সাথে তুলনা
শ্রীলঙ্কা NCC এবং বাংলাদেশের বিএনসিসি (BNCC)—উভয়ই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ক্যাডেট ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত এবং উভয়ই নিজ নিজ দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত স্বেচ্ছাসেবী যুব সংগঠন। তবে কিছু উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও রয়েছে:
| বিষয় | শ্রীলঙ্কা NCC | বাংলাদেশ বিএনসিসি (BNCC) |
|---|---|---|
| সূচনা | ১৮৮১ (রয়্যাল কলেজ, কলম্বো) | ১৯২৩ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে UTC); বিএনসিসি রূপে ১৯৭৯ |
| নিয়ন্ত্রণ | প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় | প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় |
| মূলমন্ত্র | “Discipline through Drill” | “জ্ঞান ও শৃঙ্খলা” (প্রাণসত্তা: “The Volunteers”) |
| শাখা | মূলত ডিফেন্স ও পুলিশ প্লাটুন | ত্রি-বাহিনী ভিত্তিক: সেনা, নৌ ও বিমান শাখা |
| সদস্য স্তর | মূলত স্কুল পর্যায় | স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় (জুনিয়র ও সিনিয়র ডিভিশন) |
| সার্টিফিকেট | স্পষ্ট A/B/C স্তরের তথ্য উন্মুক্ত সূত্রে নেই | পদোন্নতি পরীক্ষা ও সার্টিফিকেটভিত্তিক কাঠামো |
লক্ষণীয়, শ্রীলঙ্কা NCC মূলত স্কুল-পর্যায়ে সীমাবদ্ধ হলেও এর ইতিহাস বিএনসিসির চেয়েও পুরোনো। অন্যদিকে বিএনসিসির ত্রি-বাহিনী কাঠামো (সেনা, নৌ, বিমান) এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃতি একে একটি বিস্তৃততর কাঠামো দিয়েছে। উভয় সংগঠনই সার্কভুক্ত অঞ্চলে শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব গঠনের অভিন্ন দর্শন ধারণ করে।
৮. তথ্যসূত্র
- National Cadet Corps (Sri Lanka) — Wikipedia
- History of National Cadet Corps — cadet.gov.lk (অফিসিয়াল)
- National Cadet Corps celebrates 143rd Anniversary — Ministry of Defence, Sri Lanka
- Bangladesh National Cadet Corps — Wikipedia (তুলনার জন্য)
ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত ও সম্পাদিত: ক্যাপ্টেন মুহম্মদ জিয়াউর রহমান, বিএনসিসি অফিসার। — https://bncc.work
(সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজের চতুর্থ পর্ব। পরবর্তী পর্বে থাকছে মালদ্বীপের Maldives National Cadet Corps।)

You must be logged in to post a comment.