সার্কভুক্ত দেশগুলোর ক্যাডেট কোর নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক সিরিজের আগের সাত পর্বে আমরা ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান ও আফগানিস্তানের চিত্র দেখেছি। এই অষ্টম পর্বে আমরা ফিরে এসেছি নিজের ঘরে — বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (Bangladesh National Cadet Corps — বিএনসিসি)। পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বিএনসিসির অবস্থান কোথায়, তা-ও তুলনামূলকভাবে তুলে ধরা হলো।
ভূমিকা ও ঐতিহাসিক পটভূমি
বিএনসিসির শেকড় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠা সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে। ব্যানবেইস ও বাংলাপিডিয়াসহ বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী ১৯২৭ সালের নভেম্বরে ক্যাপ্টেন ই. গ্রুম (প্রথম অ্যাডজুটান্ট) ১০০ জন শিক্ষার্থী ও ১৬ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেন; ১৯২৮ সালের জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে University Training Corps (UTC) প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৪৩ সালে এর নাম হয় University Officers Training Corps (UOTC)। (প্রাতিষ্ঠানিক সূচনার সাল ও ভিত্তি আইনের উল্লেখ বিভিন্ন সূত্রে কিছুটা ভিন্ন — যেমন কোথাও ১৯২৩ সাল পাওয়া যায়; তাই সূত্রভেদে পার্থক্য থাকতে পারে।)
পাকিস্তান আমলে এটি স্কুল-কলেজে সম্প্রসারিত হয়ে Pakistan Cadet Corps-এর অংশ হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। স্বাধীনতার পর কলেজ পর্যায়ে Bangladesh Cadet Corps (BCC) ও জুনিয়রদের জন্য Junior Cadet Corps (JCC) গঠিত হয়। ১৯৭৯ সালের ২৩ মার্চ সরকারি আদেশে UOTC, BCC ও JCC একীভূত হয়ে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) গঠিত হয়।
সাংগঠনিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়
২০১৬ সালে সংসদে পাস হয় বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর আইন, ২০১৬ (২০১৬ সনের ৪৬ নং আইন), যা বাংলাদেশ আইন-বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট (bdlaws)-এ ২২ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখ দিয়ে প্রকাশিত। এই আইনে বিএনসিসি অধিদপ্তর, মহাপরিচালক, ইউনিট ও বিভাগ গঠন, ক্যাডেটদের ভর্তি-মেয়াদ প্রভৃতি বিষয়ের বিধান আছে। বিএনসিসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি অধিদপ্তর হিসেবে পরিচালিত হয়; সদর দপ্তর ঢাকার উত্তরা, সেক্টর-৬-এ। প্রধান হিসেবে একজন মহাপরিচালক (সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা) দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনসিসি একটি ত্রি-বাহিনী ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যার তিনটি উইং — আর্মি উইং, নেভাল উইং ও এয়ার উইং। বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজ পর্যায়ের সিনিয়র ডিভিশন (ছেলে ও মেয়ে আলাদা) এবং স্কুল পর্যায়ের জুনিয়র ডিভিশন রয়েছে। ইউনিটের সংখ্যা (রেজিমেন্ট, ফ্লোটিলা, স্কোয়াড্রন) সূত্রভেদে পরিবর্তনশীল ও সম্প্রসারণাধীন; তাই এখানে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হলো না — সর্বশেষ সংখ্যার জন্য অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ঘোষণা দেখুন।
লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মূলমন্ত্র
বিএনসিসির মূলমন্ত্র “জ্ঞান ও শৃঙ্খলা” (Knowledge & Discipline), আর এর প্রাণসত্তা “The Volunteers”। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, নেতৃত্বগুণ ও শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তোলা, জাতীয় প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে প্রস্তুত করা, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে নাগরিকদের পাশে দাঁড়ানো এবং সরকার-নির্দেশিত দায়িত্ব পালন করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
ক্যাডেট সংখ্যা ও বিস্তৃতি
বিএনসিসির বর্তমান মোট ক্যাডেট সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য, হালনাগাদ অফিসিয়াল সংখ্যা আমরা যাচাইকৃত কোনো সূত্রে পাইনি; তাই অনুমানভিত্তিক সংখ্যা দেওয়া হলো না। কাঠামোগতভাবে সংগঠনটি দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্তৃত, এবং প্রতি উপজেলায় অন্তত একটি স্কুল ও একটি কলেজে সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ আছে। ক্যাডেট হিসেবে সেবার মেয়াদ সর্বোচ্চ চার বছর।
প্রশিক্ষণ, ক্যাম্প ও কার্যক্রম
ক্যাডেটরা সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে বেসিক মিলিটারি ট্রেনিং — ড্রিল, ট্যাকটিকস, মানচিত্র পাঠ, ছোট অস্ত্র পরিচিতি ও ফায়ারিংসহ — গ্রহণ করে। প্রশিক্ষণ বিনামূল্যে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় বার্ষিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও বিজয় দিবস ক্যাম্পে অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। সামাজিক কার্যক্রমের মধ্যে আছে বৃক্ষরোপণ, রক্তদান, দুর্যোগকালীন ত্রাণ ও উদ্ধার সহায়তা, প্রাথমিক চিকিৎসা, মাদকবিরোধী র্যালি এবং স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ।
র্যাঙ্ক, সার্টিফিকেট ও সুযোগ-সুবিধা
ক্যাডেট র্যাঙ্ক: ক্যাডেট, ক্যাডেট ল্যান্স কর্পোরাল, ক্যাডেট কর্পোরাল, ক্যাডেট সার্জেন্ট ও সর্বোচ্চ ক্যাডেট আন্ডার অফিসার (CUO)। অফিসার র্যাঙ্ক: আর্মি উইংয়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যন্ত (CCO-1 থেকে CCO-5); শিক্ষকদের জন্য টিচার আন্ডার অফিসার (TUO) ও প্রফেসর আন্ডার অফিসার (PUO) ইত্যাদি পদমর্যাদা রয়েছে।
সার্টিফিকেট ও সুবিধা: বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী নিয়মিত ক্যাডেটরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিলিটারি সায়েন্স সার্টিফিকেট কোর্স করতে পারে এবং ডিগ্রি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ২৫ নম্বর পর্যন্ত বোনাস যুক্ত হয়। এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার, ভ্রমণ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন সুযোগের উল্লেখ পাওয়া যায়। (A/B/C সার্টিফিকেটের বর্তমান কাঠামো ও নির্দিষ্ট নিয়মাবলির জন্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ নীতিমালা দেখা প্রয়োজন।)
আন্তর্জাতিক বিনিময়: অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অনুযায়ী বিএনসিসির ভারত, সিঙ্গাপুর, নেপাল ও মালদ্বীপের সাথে ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম (YEP) আছে; প্রতি বছর ৫৬ জন বিএনসিসি ক্যাডেট ওইসব দেশে যায় এবং সমসংখ্যক বিদেশি ক্যাডেট স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে বাংলাদেশে আসে। (এ বিষয়ে বিস্তারিত সিরিজের পরবর্তী ঐচ্ছিক পর্বে আলোচনা করা যেতে পারে।)
বিএনসিসির সাথে তুলনা: সার্ক অঞ্চলের এক নজরে সারসংক্ষেপ
নিচের সারণিতে এই সিরিজের আগের পর্বগুলোতে আলোচিত বিষয়গুলো সংক্ষেপে বিএনসিসির সাথে মিলিয়ে দেখানো হলো। (সংশ্লিষ্ট দেশের বিস্তারিত তথ্য ও সূত্র সংশ্লিষ্ট পর্বে রয়েছে।)
| দেশ | সংগঠন/কাঠামো | প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| বাংলাদেশ | বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) | প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন অধিদপ্তর; ২০১৬ সালের আইনে প্রতিষ্ঠিত; স্বেচ্ছাসেবী ত্রি-বাহিনী (সেনা/নৌ/বিমান) কাঠামো; স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়; ১৯৭৯ সালে একীভূত রূপ |
| ভারত | National Cadet Corps (NCC) | আঞ্চলিকভাবে সবচেয়ে বৃহৎ ও সুসংগঠিত; স্কুল-কলেজভিত্তিক; সার্টিফিকেট ব্যবস্থা (পর্ব ২) |
| পাকিস্তান | National Cadet Corps (NCC) | পর্ব ৩-এ আলোচিত; ২০০২ সালে বিলুপ্তির প্রেক্ষাপটসহ |
| শ্রীলঙ্কা | National Cadet Corps | অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ক্যাডেট ঐতিহ্য (১৮৮১ থেকে); পর্ব ৪ |
| মালদ্বীপ | Maldives National Cadet Corps (MNCC) | ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রের ক্যাডেট কাঠামো; পর্ব ৫ |
| নেপাল | National Cadet Corps (রাষ্ট্রিয় সেবা দল) | নেপাল সেনাবাহিনী পরিচালিত ১০০ দিনের প্রশিক্ষণ কাঠামো; পর্ব ৬ |
| ভুটান | আনুষ্ঠানিক ক্যাডেট কোর নেই; গিয়ালসুং, দেসুং, স্কাউটস | জাতীয় সেবা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক বিকল্প কাঠামো; পর্ব ৭ |
| আফগানিস্তান | আনুষ্ঠানিক ছাত্র-ক্যাডেট কোর নেই | সামরিক একাডেমি কাঠামো ২০২১-এ ভেঙে পড়ে; বর্তমানে তুলনাযোগ্য ক্যাডেট কোর নেই; পর্ব ৭ |
পর্যালোচনা: আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বিএনসিসির তিনটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। প্রথমত, এটি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন — ভুটানের গিয়ালসুংয়ের মতো বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা নয়। দ্বিতীয়ত, এর আইনি ভিত্তি আছে (২০১৬ সালের আইন), যা প্রতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে — পাকিস্তানের NCC-এর বিলুপ্তি বা আফগানিস্তানের কাঠামো ভেঙে পড়ার অভিজ্ঞতার বিপরীতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তৃতীয়ত, শিক্ষা ও সামরিক প্রশিক্ষণের সমন্বয়ে ত্রি-বাহিনী কাঠামো এবং দুর্যোগ ও সমাজসেবায় সক্রিয় ভূমিকা বিএনসিসিকে একটি বহুমুখী যুব সংগঠনে পরিণত করেছে। আন্তর্জাতিক YEP-এর মাধ্যমে সার্ক অঞ্চলের ক্যাডেটদের সাথে যোগাযোগেরও সুযোগ রয়েছে। তবে মোট ক্যাডেট সংখ্যা ও ইউনিটের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশে আরও স্বচ্ছতা আনা গেলে তুলনামূলক গবেষণা আরও সহজ হবে।
তথ্যসূত্র
- বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর আইন, ২০১৬ (২০১৬ সনের ৪৬ নং আইন) — bdlaws.minlaw.gov.bd
- বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর অধিদপ্তর (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট)
- Banglapedia — Bangladesh National Cadet Corps
- Wikipedia — Bangladesh National Cadet Corps
- bncc.work — সিরিজের পূর্ববর্তী পর্বসমূহ
ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত ও সম্পাদিত: ক্যাপ্টেন মুহম্মদ জিয়াউর রহমান, বিএনসিসি অফিসার। — https://bncc.work






You must be logged in to post a comment.