জ্ঞান · শৃঙ্খলা · স্বেচ্ছাসেবক  •  Knowledge, Discipline, The Volunteers

Category: সার্ক ক্যাডেট কোর

সার্কভুক্ত দেশগুলোর ক্যাডেট কোর নিয়ে তুলনামূলক ও তথ্যসূত্র-নির্ভর ধারাবাহিক সিরিজ।

  • সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ (পর্ব ৮): বাংলাদেশ (বিএনসিসি) — আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে অবস্থান ও তুলনামূলক সারসংক্ষেপ

    সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ (পর্ব ৮): বাংলাদেশ (বিএনসিসি) — আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে অবস্থান ও তুলনামূলক সারসংক্ষেপ

    সার্কভুক্ত দেশগুলোর ক্যাডেট কোর নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক সিরিজের আগের সাত পর্বে আমরা ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান ও আফগানিস্তানের চিত্র দেখেছি। এই অষ্টম পর্বে আমরা ফিরে এসেছি নিজের ঘরে — বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (Bangladesh National Cadet Corps — বিএনসিসি)। পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বিএনসিসির অবস্থান কোথায়, তা-ও তুলনামূলকভাবে তুলে ধরা হলো।

    ভূমিকা ও ঐতিহাসিক পটভূমি

    বিএনসিসির শেকড় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠা সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে। ব্যানবেইস ও বাংলাপিডিয়াসহ বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী ১৯২৭ সালের নভেম্বরে ক্যাপ্টেন ই. গ্রুম (প্রথম অ্যাডজুটান্ট) ১০০ জন শিক্ষার্থী ও ১৬ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেন; ১৯২৮ সালের জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে University Training Corps (UTC) প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৪৩ সালে এর নাম হয় University Officers Training Corps (UOTC)। (প্রাতিষ্ঠানিক সূচনার সাল ও ভিত্তি আইনের উল্লেখ বিভিন্ন সূত্রে কিছুটা ভিন্ন — যেমন কোথাও ১৯২৩ সাল পাওয়া যায়; তাই সূত্রভেদে পার্থক্য থাকতে পারে।)

    পাকিস্তান আমলে এটি স্কুল-কলেজে সম্প্রসারিত হয়ে Pakistan Cadet Corps-এর অংশ হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। স্বাধীনতার পর কলেজ পর্যায়ে Bangladesh Cadet Corps (BCC) ও জুনিয়রদের জন্য Junior Cadet Corps (JCC) গঠিত হয়। ১৯৭৯ সালের ২৩ মার্চ সরকারি আদেশে UOTC, BCC ও JCC একীভূত হয়ে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) গঠিত হয়।

    সাংগঠনিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়

    ২০১৬ সালে সংসদে পাস হয় বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর আইন, ২০১৬ (২০১৬ সনের ৪৬ নং আইন), যা বাংলাদেশ আইন-বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট (bdlaws)-এ ২২ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখ দিয়ে প্রকাশিত। এই আইনে বিএনসিসি অধিদপ্তর, মহাপরিচালক, ইউনিট ও বিভাগ গঠন, ক্যাডেটদের ভর্তি-মেয়াদ প্রভৃতি বিষয়ের বিধান আছে। বিএনসিসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি অধিদপ্তর হিসেবে পরিচালিত হয়; সদর দপ্তর ঢাকার উত্তরা, সেক্টর-৬-এ। প্রধান হিসেবে একজন মহাপরিচালক (সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা) দায়িত্ব পালন করেন।

    বিএনসিসি একটি ত্রি-বাহিনী ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যার তিনটি উইং — আর্মি উইং, নেভাল উইং ও এয়ার উইং। বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজ পর্যায়ের সিনিয়র ডিভিশন (ছেলে ও মেয়ে আলাদা) এবং স্কুল পর্যায়ের জুনিয়র ডিভিশন রয়েছে। ইউনিটের সংখ্যা (রেজিমেন্ট, ফ্লোটিলা, স্কোয়াড্রন) সূত্রভেদে পরিবর্তনশীল ও সম্প্রসারণাধীন; তাই এখানে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হলো না — সর্বশেষ সংখ্যার জন্য অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ঘোষণা দেখুন।

    লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মূলমন্ত্র

    বিএনসিসির মূলমন্ত্র “জ্ঞান ও শৃঙ্খলা” (Knowledge & Discipline), আর এর প্রাণসত্তা “The Volunteers”। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, নেতৃত্বগুণ ও শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তোলা, জাতীয় প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে প্রস্তুত করা, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে নাগরিকদের পাশে দাঁড়ানো এবং সরকার-নির্দেশিত দায়িত্ব পালন করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

    ক্যাডেট সংখ্যা ও বিস্তৃতি

    বিএনসিসির বর্তমান মোট ক্যাডেট সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য, হালনাগাদ অফিসিয়াল সংখ্যা আমরা যাচাইকৃত কোনো সূত্রে পাইনি; তাই অনুমানভিত্তিক সংখ্যা দেওয়া হলো না। কাঠামোগতভাবে সংগঠনটি দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্তৃত, এবং প্রতি উপজেলায় অন্তত একটি স্কুল ও একটি কলেজে সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ আছে। ক্যাডেট হিসেবে সেবার মেয়াদ সর্বোচ্চ চার বছর।

    প্রশিক্ষণ, ক্যাম্প ও কার্যক্রম

    ক্যাডেটরা সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে বেসিক মিলিটারি ট্রেনিং — ড্রিল, ট্যাকটিকস, মানচিত্র পাঠ, ছোট অস্ত্র পরিচিতি ও ফায়ারিংসহ — গ্রহণ করে। প্রশিক্ষণ বিনামূল্যে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় বার্ষিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও বিজয় দিবস ক্যাম্পে অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। সামাজিক কার্যক্রমের মধ্যে আছে বৃক্ষরোপণ, রক্তদান, দুর্যোগকালীন ত্রাণ ও উদ্ধার সহায়তা, প্রাথমিক চিকিৎসা, মাদকবিরোধী র‍্যালি এবং স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ।

    র‍্যাঙ্ক, সার্টিফিকেট ও সুযোগ-সুবিধা

    ক্যাডেট র‍্যাঙ্ক: ক্যাডেট, ক্যাডেট ল্যান্স কর্পোরাল, ক্যাডেট কর্পোরাল, ক্যাডেট সার্জেন্ট ও সর্বোচ্চ ক্যাডেট আন্ডার অফিসার (CUO)। অফিসার র‍্যাঙ্ক: আর্মি উইংয়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যন্ত (CCO-1 থেকে CCO-5); শিক্ষকদের জন্য টিচার আন্ডার অফিসার (TUO) ও প্রফেসর আন্ডার অফিসার (PUO) ইত্যাদি পদমর্যাদা রয়েছে।

    সার্টিফিকেট ও সুবিধা: বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী নিয়মিত ক্যাডেটরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিলিটারি সায়েন্স সার্টিফিকেট কোর্স করতে পারে এবং ডিগ্রি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ২৫ নম্বর পর্যন্ত বোনাস যুক্ত হয়। এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার, ভ্রমণ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন সুযোগের উল্লেখ পাওয়া যায়। (A/B/C সার্টিফিকেটের বর্তমান কাঠামো ও নির্দিষ্ট নিয়মাবলির জন্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ নীতিমালা দেখা প্রয়োজন।)

    আন্তর্জাতিক বিনিময়: অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অনুযায়ী বিএনসিসির ভারত, সিঙ্গাপুর, নেপাল ও মালদ্বীপের সাথে ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম (YEP) আছে; প্রতি বছর ৫৬ জন বিএনসিসি ক্যাডেট ওইসব দেশে যায় এবং সমসংখ্যক বিদেশি ক্যাডেট স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে বাংলাদেশে আসে। (এ বিষয়ে বিস্তারিত সিরিজের পরবর্তী ঐচ্ছিক পর্বে আলোচনা করা যেতে পারে।)

    বিএনসিসির সাথে তুলনা: সার্ক অঞ্চলের এক নজরে সারসংক্ষেপ

    নিচের সারণিতে এই সিরিজের আগের পর্বগুলোতে আলোচিত বিষয়গুলো সংক্ষেপে বিএনসিসির সাথে মিলিয়ে দেখানো হলো। (সংশ্লিষ্ট দেশের বিস্তারিত তথ্য ও সূত্র সংশ্লিষ্ট পর্বে রয়েছে।)

    দেশ সংগঠন/কাঠামো প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য
    বাংলাদেশ বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন অধিদপ্তর; ২০১৬ সালের আইনে প্রতিষ্ঠিত; স্বেচ্ছাসেবী ত্রি-বাহিনী (সেনা/নৌ/বিমান) কাঠামো; স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়; ১৯৭৯ সালে একীভূত রূপ
    ভারত National Cadet Corps (NCC) আঞ্চলিকভাবে সবচেয়ে বৃহৎ ও সুসংগঠিত; স্কুল-কলেজভিত্তিক; সার্টিফিকেট ব্যবস্থা (পর্ব ২)
    পাকিস্তান National Cadet Corps (NCC) পর্ব ৩-এ আলোচিত; ২০০২ সালে বিলুপ্তির প্রেক্ষাপটসহ
    শ্রীলঙ্কা National Cadet Corps অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ক্যাডেট ঐতিহ্য (১৮৮১ থেকে); পর্ব ৪
    মালদ্বীপ Maldives National Cadet Corps (MNCC) ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রের ক্যাডেট কাঠামো; পর্ব ৫
    নেপাল National Cadet Corps (রাষ্ট্রিয় সেবা দল) নেপাল সেনাবাহিনী পরিচালিত ১০০ দিনের প্রশিক্ষণ কাঠামো; পর্ব ৬
    ভুটান আনুষ্ঠানিক ক্যাডেট কোর নেই; গিয়ালসুং, দেসুং, স্কাউটস জাতীয় সেবা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক বিকল্প কাঠামো; পর্ব ৭
    আফগানিস্তান আনুষ্ঠানিক ছাত্র-ক্যাডেট কোর নেই সামরিক একাডেমি কাঠামো ২০২১-এ ভেঙে পড়ে; বর্তমানে তুলনাযোগ্য ক্যাডেট কোর নেই; পর্ব ৭

    পর্যালোচনা: আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বিএনসিসির তিনটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। প্রথমত, এটি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন — ভুটানের গিয়ালসুংয়ের মতো বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা নয়। দ্বিতীয়ত, এর আইনি ভিত্তি আছে (২০১৬ সালের আইন), যা প্রতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে — পাকিস্তানের NCC-এর বিলুপ্তি বা আফগানিস্তানের কাঠামো ভেঙে পড়ার অভিজ্ঞতার বিপরীতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তৃতীয়ত, শিক্ষা ও সামরিক প্রশিক্ষণের সমন্বয়ে ত্রি-বাহিনী কাঠামো এবং দুর্যোগ ও সমাজসেবায় সক্রিয় ভূমিকা বিএনসিসিকে একটি বহুমুখী যুব সংগঠনে পরিণত করেছে। আন্তর্জাতিক YEP-এর মাধ্যমে সার্ক অঞ্চলের ক্যাডেটদের সাথে যোগাযোগেরও সুযোগ রয়েছে। তবে মোট ক্যাডেট সংখ্যা ও ইউনিটের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশে আরও স্বচ্ছতা আনা গেলে তুলনামূলক গবেষণা আরও সহজ হবে।

    তথ্যসূত্র

    ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত ও সম্পাদিত: ক্যাপ্টেন মুহম্মদ জিয়াউর রহমান, বিএনসিসি অফিসার। — https://bncc.work

  • সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ (পর্ব ৭): ভুটান ও আফগানিস্তান — ক্যাডেট ও যুব সামরিক প্রশিক্ষণের অবস্থা

    সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ (পর্ব ৭): ভুটান ও আফগানিস্তান — ক্যাডেট ও যুব সামরিক প্রশিক্ষণের অবস্থা

    সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজের সপ্তম পর্বে আমরা পৌঁছেছি এমন দুটি দেশে, যাদের গল্প আগের পর্বগুলোর থেকে কিছুটা আলাদা — ভুটান ও আফগানিস্তান। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও নেপালে আমরা দেখেছি স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সুসংগঠিত “ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর” (National Cadet Corps) ব্যবস্থা। কিন্তু ভুটান ও আফগানিস্তানে বাংলাদেশের বিএনসিসি বা ভারতের এনসিসির মতো পূর্ণাঙ্গ, স্বতন্ত্র ছাত্র-ক্যাডেট কোর নেই। এই পর্বে আমরা সততার সাথে দেখব — এই দুই দেশে যুব সামরিক ও সেবামূলক প্রশিক্ষণের বাস্তব অবস্থা কী, কোন বিকল্প কাঠামোগুলো বিদ্যমান, এবং বিএনসিসির আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে এর তাৎপর্য কী।

    ভূমিকা: কেন এই দুটি দেশ একসাথে?

    সার্কভুক্ত আট সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ভুটান ও আফগানিস্তান — উভয়েই ভৌগোলিকভাবে স্থলবেষ্টিত (landlocked) এবং জনসংখ্যায় অপেক্ষাকৃত ছোট। তবে সবচেয়ে বড় মিল হলো, কোনো দেশেই ভারত বা বাংলাদেশের মতো শতাব্দী-প্রাচীন, স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিক “ক্যাডেট কোর” গড়ে ওঠেনি। তবুও দুই দেশের অভিজ্ঞতা পরস্পরবিরোধী: ভুটান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা ও যুব-সেবা কর্মসূচি গড়ে তুলে এক নতুন মডেল হাজির করেছে, অন্যদিকে আফগানিস্তানে দীর্ঘ যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ২০২১ সালের ক্ষমতা পরিবর্তনের পর প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক প্রশিক্ষণ কাঠামো প্রায় ভেঙে পড়েছে। তাই এই পর্বে আমরা “ক্যাডেট কোর নেই” — এই সত্যকে এড়িয়ে না গিয়ে, বরং যা আছে তা নির্ভুলভাবে তুলে ধরব।


    প্রথম অংশ: ভুটান — ক্যাডেট কোর নয়, বরং জাতীয় সেবার ভিন্ন পথ

    ১. স্পষ্ট বাস্তবতা: ভুটানে আনুষ্ঠানিক ছাত্র-ক্যাডেট কোর নেই

    শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার — উন্মুক্ত ও যাচাইযোগ্য সূত্র অনুযায়ী ভুটানে ভারতের এনসিসি বা বাংলাদেশের বিএনসিসির মতো স্কুল-কলেজভিত্তিক কোনো আনুষ্ঠানিক “National Cadet Corps” নেই। ভুটানের সশস্ত্র বাহিনী হলো রয়েল ভুটান আর্মি (Royal Bhutan Army) ও রয়েল বডিগার্ড (Royal Body Guards), কিন্তু তাদের সাথে সংযুক্ত কোনো শিক্ষার্থী-ক্যাডেট শাখা নেই। তবে যুব-প্রশিক্ষণ ও জাতিগঠনের ক্ষেত্রে ভুটান তিনটি ভিন্ন কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ কাঠামো গড়ে তুলেছে — গিয়ালসুং (জাতীয় সেবা), দেসুং (শান্তির অভিভাবক) এবং ভুটান স্কাউটস।

    ২. গিয়ালসুং (Gyalsung) — বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা কর্মসূচি

    ভুটানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যুব-কর্মসূচি হলো গিয়ালসুং বা জাতীয় সেবা (National Service)। ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর ১১২তম জাতীয় দিবসে রাজকীয় ভাষণে ভুটানের রাজা (His Majesty the King) এই কর্মসূচির ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ১১ নভেম্বর ভুটানের সংসদ গিয়ালসুং আইন (Gyalsung Act) পাস করে, এবং সংবিধানের ৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটিকে “প্রত্যেক ভুটানি নাগরিকের একটি মৌলিক কর্তব্য” হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

    গিয়ালসুং ভারত বা বাংলাদেশের ক্যাডেট কোর থেকে মৌলিকভাবে আলাদা — এটি স্বেচ্ছাসেবী ছাত্র সংগঠন নয়, বরং বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা। মূল বৈশিষ্ট্যগুলো:

    • কারা অংশগ্রহণ করে: ১৮ বছর বয়সে পৌঁছানো সকল ভুটানি নাগরিক (দেশে বা বিদেশে যেখানেই থাকুক না কেন)। ২০২৫ সালের ব্যাচের জন্য এর অর্থ ২০০৬ সালে জন্মগ্রহণকারীরা।
    • প্রশিক্ষণের মেয়াদ: ২০২৬ সাল থেকে এটি এক বছরের পূর্ণকালীন সমন্বিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।
    • প্রশিক্ষণের উপাদান: প্রায় তিন মাসের মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ (basic military training), এর সাথে ব্যক্তিগত উন্নয়ন, স্বনির্ভরতা, জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় শিক্ষা (national education) বিষয়ক দক্ষতা প্রশিক্ষণ।
    • পরবর্তী দায়বদ্ধতা: প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের প্রয়োজনে ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত বাধ্যতামূলক দায়িত্বের জন্য ডাকা যেতে পারে, এরপর ৪৫ বছর পর্যন্ত রিজার্ভিস্ট হিসেবে।
    • আইনি বাধ্যবাধকতা: এটি একটি সাংবিধানিক কর্তব্য; নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে (উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসাগত কারণ, ধর্মীয় বৃত্তি) স্থগিতাদেশ ও অব্যাহতির সুযোগ আছে।

    গিয়ালসুংয়ের ঘোষিত লক্ষ্য — তরুণদের জ্ঞান, দক্ষতা ও মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করা; একাডেমিক ও পেশাগত সক্ষমতা গড়ে তোলা; স্বেচ্ছাসেবা উৎসাহিত করা; এবং জাতির ঐক্য, শান্তি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রস্তুত করা। ২০২৫ সালে এই কর্মসূচির প্রথম প্রশিক্ষণ ব্যাচ শুরু হয়, যা ভুটানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়।

    ৩. দেসুং (DeSuung) — “শান্তির অভিভাবক” স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী

    গিয়ালসুংয়ের অনেক আগে, ২০১১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ওয়াংদু ফোদরাং-এর তেনচোলিং-এ রাজার উদ্যোগে চালু হয় দেসুং (DeSuung) বা “Guardians of Peace” কর্মসূচি। প্রতিটি নাগরিক যেন স্বেচ্ছাসেবা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে জাতিগঠনে অংশ নিতে পারে — এই চিন্তা থেকেই এর জন্ম।

    • প্রকৃতি: এটি একটি স্বেচ্ছামূলক (voluntary) কর্মসূচি, বাধ্যতামূলক নয়। স্নাতক, সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক, চিকিৎসাকর্মী, কর্পোরেট কর্মী ও পর্যটন গাইডসহ নানা পেশার মানুষ এতে যোগ দেন।
    • কার্যক্রম: দুর্যোগ মোকাবিলা, জাতীয় অনুষ্ঠানে ভিড় ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা। দেসুপরা (Desuups) রয়েল ভুটান আর্মড ফোর্সেস ও অন্যান্য সংস্থাকে সহায়তা করেন; ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পের পর তারা চিকিৎসা দল পাঠিয়েছিল।
    • প্রশিক্ষণের ধরন: এটি একটি “মূল্যবোধভিত্তিক” (value-based) প্রশিক্ষণ, যা দায়িত্ববোধ, সহযোগিতা, স্বেচ্ছাসেবা ও নেতৃত্বে কেন্দ্রীভূত, একটি সম্মান-নীতিমালা (honour code) দ্বারা পরিচালিত।

    বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য — কোভিড-১৯ মহামারির সময় হাজার হাজার ভুটানি দেসুপ হিসেবে নিবন্ধন করেন এবং সীমান্ত নজরদারি, কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থাপনা ও জনসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

    ৪. ভুটান স্কাউটস (Bhutan Scouts Association)

    ভুটানে স্কুল পর্যায়ে সংগঠিত যুব-কর্মসূচির মধ্যে সবচেয়ে কাছাকাছি হলো ভুটান স্কাউটস অ্যাসোসিয়েশন (Druk Scout Tshogpa)। ভুটানে স্কাউটিং প্রবর্তিত হয় ১৯৭০ সালে, এবং ১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে এটি World Organization of the Scout Movement (WOSM)-এর সদস্যপদ লাভ করে। এটি স্কুলভিত্তিক তিনটি স্তরে বিভক্ত — কাব (প্রাথমিক), স্কাউট (মাধ্যমিক) ও রোভার (উচ্চতর)। সদস্যসংখ্যা ২০১১ সালের ১৮,১৭০ থেকে বেড়ে ২০২১ সালে প্রায় ৭৬,৮৭৬-এ পৌঁছায়।

    তবে মনে রাখা জরুরি — স্কাউটিং একটি যুব-উন্নয়ন ও নাগরিক কর্মসূচি, সামরিক ক্যাডেট প্রশিক্ষণ নয়। যদিও ফুট ড্রিল বা কিছু শারীরিক কার্যক্রম এতে থাকে, এর মূল লক্ষ্য প্রথম-সহায়তা, হাইকিং, জঙ্গল সারভাইভাল ও সমাজসেবা — সামরিক প্রস্তুতি নয়। তাই একে বিএনসিসি-এনসিসি ধাঁচের ক্যাডেট কোর বলা যাবে না।


    দ্বিতীয় অংশ: আফগানিস্তান — ভাঙা কাঠামোর এক সৎ চিত্র

    ১. স্পষ্ট বাস্তবতা: আফগানিস্তানে ছাত্র-ক্যাডেট কোর নেই

    আফগানিস্তান ২০০৭ সালে সার্কের অষ্টম সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে যোগ দেয়। কিন্তু উন্মুক্ত ও যাচাইযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, দেশটিতে কখনোই ভারত বা বাংলাদেশের মতো স্কুল-কলেজভিত্তিক আনুষ্ঠানিক “National Cadet Corps” প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দীর্ঘ কয়েক দশকের যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি স্থিতিশীল যুব-প্রশিক্ষণ কাঠামো গড়ে উঠতে দেয়নি। আমরা এখানে বানানো কোনো তথ্য উপস্থাপন করব না — বরং যা আছে তা হলো একটি অফিসার-পর্যায়ের সামরিক একাডেমির ইতিহাস, যা এখন কার্যত বন্ধ।

    ২. ন্যাশনাল মিলিটারি একাডেমি অব আফগানিস্তান (NMAA)

    আফগানিস্তানের সামরিক শিক্ষার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান ছিল ন্যাশনাল মিলিটারি একাডেমি অব আফগানিস্তান (National Military Academy of Afghanistan, NMAA), যা ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাবুলে কার্যক্রম শুরু করে। এটি ছিল চার বছর মেয়াদি একটি প্রতিষ্ঠান, যা আফগান ন্যাশনাল আর্মি ও বিমানবাহিনীর জন্য কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার তৈরি করত। স্নাতকরা স্নাতক ডিগ্রি (bachelor’s degree) পেতেন এবং সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করতেন।

    • মডেল: এটি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট পয়েন্ট (United States Military Academy) ও মার্কিন বিমানবাহিনী একাডেমির অনুকরণে গড়ে তোলা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র CSTC-A-এর মাধ্যমে পরামর্শ ও অর্থায়ন দিত, তুরস্ক একাডেমিক মেন্টর সরবরাহ করত।
    • প্রকৃতি: এটি ছিল একটি অফিসার একাডেমি — অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক ক্যাডেটদের সামরিক অফিসার হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিষ্ঠান। এটি কোনোভাবেই স্কুল-পর্যায়ের ছাত্র-ক্যাডেট কোর ছিল না। তাই বিএনসিসি বা এনসিসির সাথে এর সরাসরি তুলনা চলে না — এটি বরং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (BMA)-এর সমতুল্য।

    ৩. ২০২১-পরবর্তী পরিবর্তন

    ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সাথে সাথেই আফগান ন্যাশনাল আর্মি ও বিমানবাহিনী ভেঙে পড়ে, এবং একই দিনে ন্যাশনাল মিলিটারি একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে আফগানিস্তানে বর্তমানে কোনো স্বীকৃত, রাষ্ট্র-পরিচালিত আধুনিক সামরিক অফিসার প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বা যুব-ক্যাডেট কোর — কোনোটিই কার্যকর অবস্থায় নেই। বর্তমান প্রশাসনের অধীনে এ সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ তথ্য উন্মুক্ত সূত্রে প্রায় অনুপস্থিত। সততার খাতিরে আমরা বলছি — এই মুহূর্তে আফগানিস্তানে তুলনাযোগ্য কোনো ক্যাডেট কোর নেই, এবং এ নিয়ে অতিরিক্ত কোনো দাবি করা বস্তুনিষ্ঠতার পরিপন্থী হবে।


    তুলনামূলক মন্তব্য: দুই দেশের দুই ভিন্ন বাস্তবতা

    বিষয়ভুটানআফগানিস্তান
    আনুষ্ঠানিক ছাত্র-ক্যাডেট কোরনেইনেই
    নিকটতম বিকল্প কাঠামোগিয়ালসুং (বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা), দেসুং (স্বেচ্ছাসেবী), ভুটান স্কাউটসপূর্বে NMAA (অফিসার একাডেমি, ২০২১-এ বন্ধ)
    বর্তমান অবস্থাসক্রিয় ও সম্প্রসারমাণ (গিয়ালসুং ২০২৫-এ শুরু)ভাঙা/অনিশ্চিত
    সামরিক উপাদানগিয়ালসুংয়ে ~৩ মাস মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণপ্রযোজ্য নয় (বর্তমানে)
    প্রকৃতিজাতিগঠন ও যুব-সেবাকেন্দ্রিকপূর্বে পেশাদার অফিসার তৈরি

    ভুটানের গিয়ালসুং মডেল সার্ক অঞ্চলে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত — এটি স্কুল-ক্যাডেট কোরের পথে না গিয়ে সরাসরি সর্বজনীন বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবার পথ বেছে নিয়েছে, অনেকটা দক্ষিণ কোরিয়া বা ইসরায়েলের ধাঁচে, তবে ভুটানের নিজস্ব মূল্যবোধ (Gross National Happiness) ও সাংস্কৃতিক কাঠামোয়। অন্যদিকে আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুব-প্রশিক্ষণ কাঠামো টিকে থাকতে পারে না।

    বিএনসিসির সাথে তুলনা ও আঞ্চলিক প্রাসঙ্গিকতা

    বাংলাদেশের বিএনসিসি একটি স্বেচ্ছাসেবী, ত্রি-বাহিনীভিত্তিক ছাত্র-ক্যাডেট কোর, যার মূলমন্ত্র “জ্ঞান ও শৃঙ্খলা” এবং প্রাণসত্তা “দ্য ভলান্টিয়ার্স”। এটি ১৯২৩ সালের ইউটিসি থেকে শুরু হয়ে এক শতাব্দীর ধারাবাহিকতায় আজকের রূপ পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভুটান ও আফগানিস্তানের তুলনা আমাদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়:

    1. স্বেচ্ছাসেবা বনাম বাধ্যতামূলক: বিএনসিসি ও ভুটানের দেসুং উভয়েই স্বেচ্ছাসেবার দর্শনে বিশ্বাসী, যেখানে গিয়ালসুং বাধ্যতামূলক। বিএনসিসির স্বেচ্ছাসেবী চরিত্র তরুণদের স্বপ্রণোদিত দেশপ্রেম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এক শক্তিশালী মডেল।
    2. ধারাবাহিকতার মূল্য: বিএনসিসির শতবর্ষী ধারাবাহিকতা এর সবচেয়ে বড় শক্তি — আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রতিষ্ঠান গড়া সহজ, কিন্তু টিকিয়ে রাখা কঠিন। স্থিতিশীল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোই দীর্ঘমেয়াদে ফল দেয়।
    3. জাতিগঠনের বহুমুখী পথ: ভুটানের গিয়ালসুং-দেসুং-স্কাউটস ত্রিমুখী মডেল দেখায়, যুব-প্রশিক্ষণ কেবল সামরিক ক্যাডেট কোরেই সীমাবদ্ধ নয়। বিএনসিসিও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সমাজসেবা ও প্যারামিলিটারি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এই বহুমুখী ভূমিকায় এগিয়ে যেতে পারে।

    সব মিলিয়ে, এই পর্বের সবচেয়ে বড় বার্তা হলো — একটি দেশের যুবশক্তিকে সুসংগঠিত করার কোনো একক “সঠিক” মডেল নেই। বাংলাদেশের বিএনসিসি তার স্বেচ্ছাসেবী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ও ধারাবাহিক কাঠামো নিয়ে সার্ক অঞ্চলে এক পরিণত ও স্থিতিশীল দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।


    তথ্যসূত্র

    বি.দ্র.: ভুটান ও আফগানিস্তানে পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক ক্যাডেট কোর না থাকায় এই পর্বে উপলব্ধ ও যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বিকল্প যুব-প্রশিক্ষণ কাঠামো উপস্থাপন করা হয়েছে। যেখানে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি, সেখানে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে — বানানো কোনো তথ্য এখানে নেই।

    ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত ও সম্পাদিত: ক্যাপ্টেন মুহম্মদ জিয়াউর রহমান, বিএনসিসি অফিসার। — https://bncc.work

  • সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ (পর্ব ৬): নেপাল — National Cadet Corps (NCC)

    সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ (পর্ব ৬): নেপাল — National Cadet Corps (NCC)

    সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজের আগের পাঁচটি পর্বে আমরা দেখেছি সার্কভুক্ত দেশগুলোর সামগ্রিক পরিচিতি এবং ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের ক্যাডেট কোরের ইতিহাস ও কাঠামো। এই ষষ্ঠ পর্বে আলোচনা করব হিমালয়কন্যা নেপালের National Cadet Corps (NCC) নিয়ে—যা দেশটিতে রাষ্ট্রিয় সেবা দল (Rastriya Sewa Dal / National Service Corps) নামেও পরিচিত। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ক্যাডেট সংগঠনের তুলনায় নেপালের মডেলটি কিছুটা ভিন্ন—এটি সরাসরি স্কুল-পর্যায়ের একটি যুব-উন্নয়ন কর্মসূচি, যা নেপাল সেনাবাহিনী পরিচালনা করলেও একে সামরিক নিয়োগের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা হয় না।

    ১. ভূমিকা ও ঐতিহাসিক পটভূমি

    নেপালে ক্যাডেট প্রশিক্ষণের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ১৯৬৫ সালে (২০২২ বিক্রম সংবৎ)। প্রাথমিকভাবে এটি “National Student Soldier Service Corps” নামে প্রস্তাবিত হলেও পরে “National Service Corps / রাষ্ট্রিয় সেবা দল” নামে চূড়ান্ত হয়। উন্মুক্ত সূত্র অনুযায়ী—

    • ১৯৬৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়; ১৩ অক্টোবর একটি তিন সদস্যের কমিটি প্রথম বৈঠকে বসে।
    • ২৩ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদন দেয় এবং তৎকালীন রাজা মহেন্দ্র রাজকীয় সম্মতি দেন।
    • সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ৭ নভেম্বর ১৯৬৫।
    • আইনি ভিত্তি আসে পাঁচ বছর পর—National Service Corps Act, 2027 বিক্রম সংবৎ (১৯৭০)-এর মাধ্যমে।

    শুরুতে কাঠমান্ডুতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৫০০ ক্যাডেট ভর্তির পরিকল্পনা ছিল এবং প্রশিক্ষণ-মেয়াদ ছিল তিন বছর—যা পরে কমিয়ে দুই বছর ও পরবর্তীতে এক বছরে (বর্তমানে ১০০ দিনে) আনা হয়। ১৯৭৪ সাল নাগাদ কার্যক্রম কাঠমান্ডুর বাইরে ছড়িয়ে পড়ে, এবং ২০১৮ সাল থেকে নেপাল সেনাবাহিনী এটিকে দেশের সবকটি (৭৭টি) জেলায় সম্প্রসারিত করে।

    ২. সাংগঠনিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়

    নেপাল NCC-এর পরিচালন-কাঠামোটি সার্কভুক্ত অন্য দেশগুলোর তুলনায় একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বহন করে—সরকার কর্মসূচির নীতি ও বাজেট নির্ধারণ করে, আর নেপাল সেনাবাহিনী (Nepali Army) এর প্রশাসন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকে।

    • পৃষ্ঠপোষক: দেশের প্রধানমন্ত্রী (Patron) NCC-এর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বিবেচিত।
    • পরিচালনা পর্ষদ: পর্ষদে শিক্ষা সচিব ও প্রতিরক্ষা সচিবসহ বেসামরিক কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত; নীতিগত ও বাজেট-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বেসামরিক সরকারের হাতেই থাকে।
    • প্রশিক্ষক: নিয়মিত নেপাল সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
    • নির্বাচন নীতিমালা: “Commander-in-Chief Command Guidance, 2081 BS (2024)” অনুযায়ী জনসংখ্যা-ঘনত্ব ও ভৌগোলিক বিবেচনায় ক্যাডেট নির্বাচন করা হয়; নারী-পুরুষ ৫০-৫০ কোটা এবং নির্বাচিতদের প্রায় ৬০% সরকারি/কমিউনিটি স্কুল থেকে নেওয়া হয়।

    লক্ষণীয়, নেপালের মডেলে NCC-কে একটি যুব-উন্নয়ন ও স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—সেনাবাহিনীতে সরাসরি নিয়োগের উৎস হিসেবে নয়। অংশগ্রহণ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক এবং অভিভাবক ও স্কুলের লিখিত সম্মতি আবশ্যক।

    ৩. লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মূলমন্ত্র

    নেপাল NCC-এর মূলমন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয় “Discipline is the Foundation of National Service” (রাষ্ট্রসেবার ভিত্তি অনুশাসন তথা শৃঙ্খলা)। এই ভাবনাটি সংগঠনের নাম “রাষ্ট্রিয় সেবা দল”-এর সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ—অর্থাৎ শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে জাতির সেবা।

    ঘোষিত উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, শারীরিক সক্ষমতা, দেশপ্রেম, নাগরিক দায়িত্ববোধ ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা; এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, উদ্ধার ও সমাজসেবায় সক্ষম স্বেচ্ছাসেবী মানবসম্পদ প্রস্তুত করা। নেপালের ভূমিকম্প-বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ বাস্তবতায় এই দুর্যোগ-সাড়াদান দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; সাম্প্রতিক বন্যায় NCC ক্যাডেটদের স্বেচ্ছাসেবী সহায়তার উদাহরণও সংবাদে এসেছে।

    ৪. ক্যাডেট সংখ্যা ও বিস্তৃতি

    নেপাল NCC বর্তমানে দেশের সবকটি জেলায় বিস্তৃত। উন্মুক্ত সূত্রে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান (সততার স্বার্থে পরিসরসহ উল্লেখ করা হলো):

    • বিস্তৃতি: ২০১৮ সাল থেকে দেশের সবকটি ৭৭টি জেলা।
    • মোট প্রশিক্ষিত: প্রতিষ্ঠার পর থেকে আনুমানিক ৮৬,০০০–৮৯,৮৯৪ জন শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে (সূত্রভেদে সামান্য ভিন্নতা)।
    • বার্ষিক অংশগ্রহণ: বর্তমানে বছরে প্রায় ৭,৭০০–৭,৭১০ জন ক্যাডেট; সরকারের লক্ষ্য বছরে ১১,৫৫০ জনে উন্নীত করা।

    দুটি ডিভিশনে ক্যাডেটরা বিভক্ত:

    • জুনিয়র ডিভিশন: অষ্টম–দশম শ্রেণি (সাধারণত ১৩–১৮ বছর)।
    • সিনিয়র ডিভিশন: একাদশ–দ্বাদশ শ্রেণি (সাধারণত ১৬–২১ বছর)।

    (উল্লেখ্য: অংশগ্রহণকারী মোট স্কুল-সংখ্যার কোনো নির্দিষ্ট হালনাগাদ অফিসিয়াল হিসাব উন্মুক্ত সূত্রে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি—তাই এ বিষয়ে নির্দিষ্ট দাবি করা হলো না।)

    ৫. প্রশিক্ষণ, ক্যাম্প ও কার্যক্রম

    নেপাল NCC-এর বর্তমান প্রশিক্ষণ কাঠামো ১০০ দিনের, যা দুই ধাপে বিভক্ত:

    • প্রথম ধাপ — প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ: নিজ স্কুলে প্রায় ৭৯ দিন, NCC প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে।
    • দ্বিতীয় ধাপ — আবাসিক শিবির: নেপাল সেনাবাহিনীর ব্যারাক/প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ২১ দিনের আবাসিক ক্যাম্প। রাষ্ট্রিয় সেবা দলের প্রধান শিবির-কেন্দ্রগুলো রয়েছে মোরাং, মহোত্তরী, নওয়ালপরাসি ও বাঁকে জেলায়।

    প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে—ইউনিফর্ম, খাবার, আবাসন, উপকরণ ও বীমা সুবিধা প্রদান করা হয়। মূল প্রশিক্ষণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ড্রিল ও খুকুরি ড্রিল, শারীরিক সক্ষমতা, প্রাথমিক চিকিৎসা, ম্যাপ রিডিং, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অনুসন্ধান-উদ্ধার, ফিল্ডক্রাফট ও ব্যাটলক্রাফট, নেতৃত্ব এবং ক্রীড়া। সিনিয়র ডিভিশনের ক্যাডেটরা অতিরিক্তভাবে অস্ত্র-পরিচিতি ও ফায়ারিং (৭.৬২ মিমি SLR), ওয়াল/রক ক্লাইম্বিং, ঘোড়ায় চড়া, সাঁতার ও ফিল্ড এক্সারসাইজের সুযোগ পায়।

    📌 ২০২৬ সালের হালনাগাদ (নতুন বিল): ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী বালেন্দ্র (বালেন) শাহ পুরোনো National Service Corps Act, 2027 (1970) প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যে একটি নতুন বিল সংসদে উত্থাপন করেন। প্রস্তাবিত আইনে অষ্টম–দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি, আনুষ্ঠানিক সমাপনী সনদ, এবং জাতীয় জরুরি অবস্থায় (দুর্যোগ, যুদ্ধ বা অভ্যন্তরীণ সংকট) মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে স্বেচ্ছাসেবক সমাবেশের আইনি ভিত্তি রাখা হয়েছে। (সততার স্বার্থে: বিলটির আইনি অগ্রগতি নিয়ে সূত্রভেদে তথ্য ভিন্ন—একটি সূত্রে একে সংসদে নিবন্ধিত/বিচারাধীন বলা হয়েছে, আরেকটি বিশ্লেষণধর্মী সূত্রে প্রতিনিধি সভায় পাসের কথা উল্লেখ আছে; তাই এটিকে “আইনি প্রক্রিয়াধীন” হিসেবেই উপস্থাপন করা হলো।)

    ৬. র‍্যাঙ্ক, সার্টিফিকেট ও সুযোগ-সুবিধা

    র‍্যাঙ্ক কাঠামো: ভারত বা বাংলাদেশের বিএনসিসির মতো সুস্পষ্ট ক্যাডেট র‍্যাঙ্ক-ক্রম (ল্যান্স কর্পোরাল, কর্পোরাল, সার্জেন্ট ইত্যাদি) নেপাল NCC সম্পর্কে উন্মুক্ত সূত্রে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না। সংগঠনটিকে মূলত একটি স্কুল-পর্যায়ের যুব-উন্নয়ন কর্মসূচি হিসেবে পরিচালনা করা হয়। (সততার স্বার্থে: নির্দিষ্ট র‍্যাঙ্ক-ব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় এখানে কোনো দাবি করা হলো না।)

    সার্টিফিকেট: প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারীরা একটি আনুষ্ঠানিক সমাপনী সনদ পান (নতুন প্রস্তাবিত আইনেও এটি নিশ্চিত করা হয়েছে)। তবে ভারত/বিএনসিসির মতো “A/B/C” স্তরভিত্তিক সার্টিফিকেট ব্যবস্থার তথ্য নেপাল NCC সম্পর্কে পাওয়া যায় না।

    সুযোগ-সুবিধা ও আঞ্চলিক সংযোগ: কৃতী ক্যাডেটদের জন্য সার্কভুক্ত দেশ ও সিঙ্গাপুরে বিনিময় সফর, এবং ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে—যা দক্ষিণ এশিয়ার ক্যাডেট সংগঠনগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। তবে সমালোচকরা মনে করেন, ভারত বা শ্রীলঙ্কার মতো স্নাতক ক্যাডেটদের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রণোদনা (যেমন—চাকরিতে অগ্রাধিকার) নেপালে এখনও সীমিত, এবং সীমিত অর্থায়ন ও জেলাভেদে অসম সুবিধা একটি চ্যালেঞ্জ।

    ৭. বিএনসিসির সাথে তুলনা

    নেপাল NCC এবং বাংলাদেশের বিএনসিসি (BNCC)—উভয়ই তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও দেশপ্রেম গড়ার অভিন্ন দর্শন ধারণ করলেও কাঠামো ও পরিচালনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে:

    বিষয়নেপাল NCC (রাষ্ট্রিয় সেবা দল)বাংলাদেশ বিএনসিসি (BNCC)
    সূচনা১৯৬৫১৯২৩ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে UTC); বিএনসিসি রূপে ১৯৭৯
    নিয়ন্ত্রণনেপাল সেনাবাহিনী পরিচালিত; প্রধানমন্ত্রী পৃষ্ঠপোষক, বেসামরিক সরকারের নীতিগত তত্ত্বাবধানেপ্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়
    মূলমন্ত্র“Discipline is the Foundation of National Service”“জ্ঞান ও শৃঙ্খলা” (প্রাণসত্তা: “The Volunteers”)
    শাখাএকক স্কুলভিত্তিক কর্মসূচি (জুনিয়র ও সিনিয়র ডিভিশন)ত্রি-বাহিনী ভিত্তিক: সেনা, নৌ ও বিমান শাখা
    সদস্য স্তরশুধু স্কুল (অষ্টম–দ্বাদশ শ্রেণি)স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়
    প্রশিক্ষণ মেয়াদ১০০ দিন (৭৯ দিন স্কুল + ২১ দিন আবাসিক ক্যাম্প)ধারাবাহিক প্লাটুন প্রশিক্ষণ ও ক্যাম্পিং
    র‍্যাঙ্ক/সার্টিফিকেটস্পষ্ট র‍্যাঙ্ক-ক্রম উন্মুক্ত সূত্রে নেই; আনুষ্ঠানিক সমাপনী সনদপদোন্নতি র‍্যাঙ্ক ও সার্টিফিকেটভিত্তিক কাঠামো

    সারকথা, নেপাল NCC মূলত একটি স্কুল-কেন্দ্রিক, দুর্যোগ-সাড়াদান ও নাগরিক-সেবামুখী স্বল্পমেয়াদি কর্মসূচি, যেখানে বিএনসিসি একটি ত্রি-বাহিনী ভিত্তিক, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল—নেপাল তার কৃতী ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণের জন্য যেসব দেশে পাঠায়, সেই তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে; অর্থাৎ বিএনসিসি ও নেপাল NCC-এর মধ্যে আঞ্চলিক ক্যাডেট-বিনিময়ের একটি বাস্তব সংযোগ বিদ্যমান।

    ৮. তথ্যসূত্র

    ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত ও সম্পাদিত: ক্যাপ্টেন মুহম্মদ জিয়াউর রহমান, বিএনসিসি অফিসার। — https://bncc.work

    (সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজের ষষ্ঠ পর্ব। পরবর্তী পর্বে থাকছে ভুটান ও আফগানিস্তানে ক্যাডেট/যুব সামরিক প্রশিক্ষণের অবস্থা।)

  • সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ (পর্ব ৫): মালদ্বীপ — Maldives National Cadet Corps (MNCC)

    সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজের পঞ্চম পর্বে আমরা পৌঁছেছি ভারত মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপে। আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও মালদ্বীপের ক্যাডেট আন্দোলনের ইতিহাস দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন — এর শিকড় প্রোথিত ১৯৪৫ সালে। মালদ্বীপ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (Maldives National Cadet Corps — MNCC) আজ দেশটির বৃহত্তম যুব সংগঠন। এই পর্বে আমরা জানব MNCC-এর ইতিহাস, কাঠামো, প্রশিক্ষণ, র‍্যাঙ্ক ও মূলমন্ত্র, এবং বাংলাদেশের বিএনসিসির সাথে এর তুলনামূলক পর্যালোচনা।

    ভূমিকা ও ঐতিহাসিক পটভূমি

    মালদ্বীপে সংগঠিত ক্যাডেট কার্যক্রমের সূচনা ঘটে ১৯ মার্চ ১৯৪৫ সালে, রাজধানী মালের ঐতিহ্যবাহী মাজিদিয়া স্কুলে (Majeediyya School, তৎকালীন মাদ্রাসাতুল সানিয়্যা)। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ও স্কুলটির প্রিন্সিপাল আল-আমির মোহাম্মদ আমিন দিদি (Mohamed Amin Didi) নির্বাচিত ৬০ জন ছাত্রকে নিয়ে একটি বিশেষ দল গঠন করেন, যার নাম ছিল “খাস্সা পার্টি” (Khaassa Party)। প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ সার্জেন্টরা এই দলকে ফুট ড্রিল, সাঁতার ও নৌকা বাওয়ার প্রশিক্ষণ দিতেন। এই অর্থে মালদ্বীপের ক্যাডেট আন্দোলন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন ক্যাডেট ঐতিহ্যগুলোর একটি।

    ১৯৬০ সালে মাজিদিয়া স্কুলে ইংরেজি-মাধ্যম শিক্ষা চালু হলে প্রিন্সিপাল জে. ভি. হিল (JV Hill) দলটির নাম পরিবর্তন করে রাখেন মাজিদিয়া ক্যাডেট কোর (Majeediyya Cadet Corps — MCC)। ২৫ আগস্ট ১৯৬৩ সালে ক্যাডেটরা প্রথমবারের মতো শপথ গ্রহণ করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র হাতে পায়; এ সময় তাদের দুটি কোম্পানিতে বিভক্ত করা হয়। পরবর্তী দশকগুলোতে মালদ্বীপের ক্যাডেটরা শ্রীলঙ্কার দিয়াতালাওয়া (Diyatalawa) ক্যাডেট ক্যাম্পে অংশ নিতে শুরু করে — ১৯৬৬ সালে ২৩ জন এবং ১৯৬৮ সালে ২৫ জন ক্যাডেট সেখানে গিয়ে ড্রিল ও শুটিংয়ে কৃতিত্ব অর্জন করে।

    আন্দোলনের সূচনার ৫০ বছর পূর্তি (সুবর্ণজয়ন্তী) উপলক্ষে ২৫ জুলাই ১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাউমুন আব্দুল গাইয়ুম (Maumoon Abdul Gayoom) সংগঠনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মালদ্বীপ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (MNCC) হিসেবে উদ্বোধন করেন। এরপর ২৫ জুলাই ২০১০ সালে ১৫তম বার্ষিকীতে তিনটি উইং (Wing) চালু করা হয় এবং ১৯ মার্চ ২০২০ সালে পালিত হয় মালদ্বীপের ক্যাডেট আন্দোলনের ৭৫ বছর পূর্তির ডায়মন্ড জুবিলি।

    সাংগঠনিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়

    MNCC-কে বর্ণনা করা হয় মালদ্বীপ ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স (Maldives National Defence Force — MNDF)-এর যুব শাখা হিসেবে। তবে এর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে: সংগঠনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের (Ministry of Education) অধীনে পরিচালিত হয়, আর প্রশিক্ষণ ও রসদ-সংক্রান্ত (logistic) সহায়তা আসে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তথা MNDF থেকে। অর্থাৎ শিক্ষা ও প্রতিরক্ষা — এই দুই মন্ত্রণালয়ের যৌথ সমন্বয়ে এটি কাজ করে। সদর দপ্তর রাজধানী মালের ফিলা বিল্ডিং, বোদুথাকুরুফানু মাগুতে (Filaa Building, Boduthakurufaanu Magu, Malé) অবস্থিত।

    নেতৃত্বকাঠামোর শীর্ষে রয়েছেন সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে দেশের রাষ্ট্রপতি, এবং ডেপুটি সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী। দৈনন্দিন পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন একজন কমান্ডিং অফিসার (সাধারণত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার), একজন অ্যাডজুট্যান্ট এবং MNCC-এর ডিরেক্টর ও ডেপুটি ডিরেক্টর। সংগঠনটির তিনটি উইং রয়েছে — আর্মি উইং (Army Wing), সি উইং (Sea Wing) ও পুলিশ উইং (Police Wing) — যেগুলো ২০১০ সালে চালু হয়। ভৌগোলিকভাবে পুরো দেশকে চারটি এরিয়া রেজিমেন্টে ভাগ করা হয়েছে: নর্দার্ন এরিয়া, মালে এরিয়া, সেন্ট্রাল এরিয়া ও সাউদার্ন এরিয়া। MNCC-এর নিজস্ব রং লাল ও সবুজ, এবং এর পতাকা লাল রঙের মাঝে সংগঠনের মনোগ্রাম সংবলিত।

    লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মূলমন্ত্র

    MNCC-এর মূলমন্ত্র (Motto): “To Obey and To Be Loyal” — অর্থাৎ “আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা”। এর পাশাপাশি সংগঠনটির রয়েছে একটি সম্মান-নীতি (Honor Code): “আমরা মিথ্যা বলব না, চুরি করব না, প্রতারণা করব না এবং আমাদের মধ্যে কাউকে এসব করতে দেব না।”

    সংগঠনটির ঘোষিত ভিশন হলো নেতৃত্ব, দেশপ্রেম ও সেবার মনোভাবসম্পন্ন অনুকরণীয় তরুণ নাগরিক গড়ে তোলা। মিশন হিসেবে তারা এমন যুবসমাজ তৈরি করতে চায় যারা ইসলামি মূল্যবোধ ধারণ করবে, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব দেবে, জাতীয় উন্নয়নে অংশ নেবে এবং দুর্যোগে দৃঢ়তা দেখাবে। মূল দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে — ঈমান, দেশপ্রেম ও চরিত্র গঠন; দুর্যোগ মোকাবিলা ও জাতীয় নিরাপত্তায় সহায়তার জন্য ক্যাডেটদের প্রস্তুত করা; এবং আত্মবিশ্বাস, দলগত কাজ ও নেতৃত্বের গুণ বিকাশ। লক্ষণীয়, মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে মালদ্বীপের ক্যাডেট প্রশিক্ষণে ইসলামি মূল্যবোধকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

    ক্যাডেট সংখ্যা ও বিস্তৃতি

    MNCC-কে বলা হয় মালদ্বীপের বৃহত্তম যুব সংগঠন। সদস্যভুক্ত হয় দেশজুড়ে বিভিন্ন স্কুলের ক্যাডেট ও ব্যান্ড সদস্য (bandsmen), যাদের বয়স ১১ বছরের বেশি। অফিসিয়াল সূত্র অনুযায়ী সংগঠনটি চারটি এরিয়া রেজিমেন্টের অধীনে প্রায় ৩৯টি স্কুলে বিস্তৃত — নর্দার্ন এরিয়ায় ৯টি, মালে এরিয়ায় ১৭টি, সেন্ট্রাল এরিয়ায় ২টি এবং সাউদার্ন এরিয়ায় ১১টি।

    সততার সাথে একটি স্পষ্টীকরণ: মালদ্বীপ একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র হওয়ায় MNCC-এর বর্তমান মোট ক্যাডেট সংখ্যার কোনো নির্দিষ্ট, হালনাগাদ অফিসিয়াল পরিসংখ্যান উন্মুক্ত সূত্রে পাওয়া যায়নি; তাই এখানে কোনো আনুমানিক সংখ্যা দাবি করা হলো না। কাঠামোগত দিক থেকে জানা যায় — একটি প্লাটুন চালু করতে ন্যূনতম ৩২ জন তালিকাভুক্ত শিক্ষার্থী প্রয়োজন; একটি কোম্পানিতে ১০০-এর কম ক্যাডেট থাকলে একজন জুনিয়র আন্ডার অফিসার এবং ১০০-এর বেশি হলে একজন সিনিয়র আন্ডার অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়।

    প্রশিক্ষণ, ক্যাম্প ও কার্যক্রম

    MNCC-এর স্কুল ক্যাডেট প্রশিক্ষণ পাঁচ বছরব্যাপী (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি) একটি কাঠামোবদ্ধ মডিউল-ভিত্তিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। প্রতিটি মডিউলে নির্দিষ্ট কন্টাক্ট আওয়ার (contact hours) বরাদ্দ থাকে:

    • মডিউল ১ — ইনডাকশন প্রোগ্রাম (২০ ঘণ্টা): ফুট ড্রিল ও MNCC নিয়মাবলি।
    • মডিউল ২ — বেসিক ট্রেনিং (৫০ ঘণ্টা): ফুট ড্রিল, শারীরিক প্রশিক্ষণ, অগ্নিনির্বাপণ, প্রাথমিক চিকিৎসা, ব্যক্তিত্ব বিকাশ ও নেতৃত্ব।
    • মডিউল ৩ — অ্যাডভান্স ট্রেনিং (৫০ ঘণ্টা): শারীরিক প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব, নাগরিক শিক্ষা, রাইফেল ড্রিল।
    • মডিউল ৪ — NCO ট্রেনিং (৩০ ঘণ্টা): দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব, রাইফেল ও সেরিমোনিয়াল ড্রিল।
    • মডিউল ৫ — সিনিয়র NCO ট্রেনিং (৩০ ঘণ্টা): নেতৃত্ব, শিক্ষণ-কৌশল, কেইন ড্রিল ও ফ্ল্যাগ ড্রিল।

    সাধারণ ক্যাডেটদের পাশাপাশি ব্যান্ড ক্যাডেটদের জন্য রয়েছে সঙ্গীত-বিষয়ক আলাদা সমান্তরাল মডিউল (সুরজ্ঞান, বাদ্যযন্ত্র দক্ষতা, কন্ডাক্টিং ইত্যাদি)। ক্যাম্পের ক্ষেত্রে রয়েছে বেসিক ক্যাডেট ক্যাম্প, অ্যাডভান্স ক্যাডেট ক্যাম্প ও ন্যাশনাল ক্যাডেট ক্যাম্প; অগ্রসর প্রশিক্ষণের জন্য আগের স্তরের ক্যাম্প সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় ক্যাডেট ক্যাম্প — যেমন ২৫তম ন্যাশনাল ক্যাডেট ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয় ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত। এছাড়া মালদ্বীপ সক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক ক্যাডেট বিনিময় কর্মসূচিতে (International Cadet Exchange Program) অংশ নেয়; গিরিফুশি (Girifushi) প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এই কার্যক্রমের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

    র‍্যাঙ্ক, সার্টিফিকেট ও সুযোগ-সুবিধা

    স্কুল ক্যাডেটদের জন্য MNCC-এর র‍্যাঙ্ক-কাঠামো নিম্নধাপ থেকে ঊর্ধ্বক্রমে সাজানো: ক্যাডেট প্রাইভেট (PTE) → ল্যান্স কর্পোরাল (LCPL) → কর্পোরাল (CPL) → সার্জেন্ট (SGT) → স্টাফ সার্জেন্ট (SSGT) → কোম্পানি সার্জেন্ট মেজর (CSM) → জুনিয়র আন্ডার অফিসার (JUO) → সিনিয়র আন্ডার অফিসার (SUO) → ব্যাটালিয়ন আন্ডার অফিসার (BUO)। এর বাইরে প্রশিক্ষক (instructor) পর্যায়ে রয়েছে ক্যাডেট ইনস্ট্রাক্টর ট্রেইনি (CIT), ওয়ারেন্ট অফিসার (WO1–WO4) এবং NCC লেফটেন্যান্ট থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যন্ত কমিশন্ড পদমর্যাদা।

    সততার সাথে উল্লেখযোগ্য একটি পার্থক্য: ভারত বা বাংলাদেশের মতো সুস্পষ্ট ‘A/B/C’ সার্টিফিকেট স্তরবিন্যাস MNCC-এর ক্ষেত্রে উন্মুক্ত সূত্রে পাওয়া যায়নি। পরিবর্তে এখানে ক্যাডেটদের অর্জন স্বীকৃত হয় প্রশিক্ষণ মডিউল সম্পন্নের ভিত্তিতে — যোগ্যতা-ব্যাজ, ক্যাম্প-ব্যাজ, রিবন ও মেডেলের মাধ্যমে। ভারত, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশ ও নেপালে অনুষ্ঠিত বিদেশি ক্যাম্পে অংশগ্রহণের জন্য আলাদা “ওভারসিজ ক্যাম্প রিবন”-ও দেওয়া হয়। সুযোগ-সুবিধার মূল আকর্ষণ হলো নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্যাম্পে অংশগ্রহণ, এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

    বিএনসিসির সাথে তুলনা

    বাংলাদেশের বিএনসিসি (BNCC) ও মালদ্বীপের MNCC — উভয়ই দক্ষিণ এশিয়ার ক্যাডেট ঐতিহ্যের অংশীদার, তবে দুটির মধ্যে মিল ও পার্থক্য উভয়ই চোখে পড়ে:

    • প্রতিষ্ঠা ও ঐতিহ্য: বিএনসিসির শিকড় ১৯২৩ সালের ইউনিভার্সিটি ট্রেনিং কোর (UTC) পর্যন্ত বিস্তৃত; MNCC-এর সংগঠিত সূচনা ১৯৪৫ সালে। উভয় সংগঠনই এক শতাব্দীর কাছাকাছি প্রাচীন ঐতিহ্যের দাবিদার।
    • নিয়ন্ত্রণ: বিএনসিসি সরাসরি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে; MNCC মূলত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে, MNDF কেবল প্রশিক্ষণ-সহায়তা দেয় — এটি একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য।
    • শাখা/উইং: বিএনসিসি একটি ত্রি-বাহিনীভিত্তিক (সেনা, নৌ ও বিমান শাখা) সংগঠন; MNCC-এর তিনটি উইং হলো আর্মি, সি ও পুলিশ — অর্থাৎ MNCC-তে বিমান শাখার বদলে পুলিশ উইং রয়েছে।
    • পরিসর: বিএনসিসি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় — তিন স্তরেই বিস্তৃত এবং সদস্য সংখ্যায় অনেক বড়; MNCC মূলত স্কুল পর্যায়ে (ষষ্ঠ–দশম শ্রেণি) কেন্দ্রীভূত এবং ছোট দেশ হিসেবে পরিসরেও সীমিত।
    • মূলমন্ত্র: বিএনসিসির মূলমন্ত্র “জ্ঞান ও শৃঙ্খলা”; MNCC-এর মূলমন্ত্র “আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা”। MNCC-এর প্রশিক্ষণে ইসলামি মূল্যবোধ স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত।
    • সার্টিফিকেট: বিএনসিসিতে ক্যাডেট পদোন্নতি ও সার্টিফিকেট (A/B/C) ব্যবস্থা স্পষ্ট; MNCC-তে এর পরিবর্তে মডিউল, ব্যাজ ও রিবনভিত্তিক স্বীকৃতি ব্যবস্থা প্রচলিত।

    দুই দেশের ক্যাডেট সম্পর্কের একটি উষ্ণ দিকও আছে: ২০১৪ সালে মালদ্বীপের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের বিজয় দিবস ক্যাম্পে অংশ নেয় এবং ২০১৬ সালে বিএনসিসির একটি প্রতিনিধিদল মালদ্বীপ সফর করে। মালদ্বীপ বর্তমানে ভারত, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশ ও নেপাল — এই পাঁচটি দেশের সাথে ক্যাডেট বিনিময় কর্মসূচি পরিচালনা করে, যেখানে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

    তথ্যসূত্র

    ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত ও সম্পাদিত: ক্যাপ্টেন মুহম্মদ জিয়াউর রহমান, বিএনসিসি অফিসার। — https://bncc.work

  • সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ (পর্ব ৪): শ্রীলঙ্কা — National Cadet Corps (NCC)

    সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজের আগের তিনটি পর্বে আমরা দেখেছি সার্কভুক্ত দেশগুলোর সামগ্রিক পরিচিতি, ভারতের বিশাল National Cadet Corps (NCC) এবং পাকিস্তানের NCC-এর ইতিহাস। এই চতুর্থ পর্বে আলোচনা করব দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীনতম ক্যাডেট সংগঠন—শ্রীলঙ্কার ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (National Cadet Corps, NCC) নিয়ে। ১৮৮১ সাল থেকে চলে আসা এই সংগঠনটিকে শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ইউনিফর্মধারী যুব-উন্নয়ন সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে।

    ১. ভূমিকা ও ঐতিহাসিক পটভূমি

    শ্রীলঙ্কায় ক্যাডেট প্রশিক্ষণের সূচনা হয় ১৮৮১ সালে, কলম্বোর ঐতিহ্যবাহী রয়্যাল কলেজ (Royal College, Colombo)-এ। তৎকালীন অধ্যক্ষ জন বি. কাল (John B. Cull)-এর উদ্যোগে “ড্রিলের মাধ্যমে শৃঙ্খলা গড়ে তোলার” লক্ষ্যে এই কার্যক্রম শুরু হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে এটি সিলন লাইট ইনফ্যান্ট্রির (Ceylon Light Infantry) সঙ্গে যুক্ত ক্যাডেট ব্যাটালিয়ন হিসেবে পরিচালিত হতো।

    দীর্ঘ পথচলায় সংগঠনটির নাম ও কাঠামো কয়েকবার পরিবর্তিত হয়েছে:

    • Ceylon Cadet Battalion — ব্রিটিশ আমলে ক্যাডেট ব্যাটালিয়ন গঠন (১৯১৯ নাগাদ কাঠামোবদ্ধ)।
    • Ceylon Cadet Corps (CCC) — ১৯৫০ সালে সিলন সেনাবাহিনীর (Ceylon Army) অধীনে পুনর্গঠন।
    • Sri Lanka Cadet Corps (SLCC) — ১৯৭২ সালে শ্রীলঙ্কা প্রজাতন্ত্র ঘোষণার পর নামকরণ।
    • National Cadet Corps (NCC) — ১৯৮৮ সালের ২৯ এপ্রিল পুলিশ ক্যাডেটিং-এর সঙ্গে একীভূত হয়ে বর্তমান “ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর” গঠিত হয়। ১৯৮৯ সাল থেকে এটি সরাসরি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আসে।

    ঐতিহাসিকভাবে শ্রীলঙ্কার ক্যাডেটরা যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ৩৩০ জন ক্যাডেট স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেন; তাঁদের একজন লেফটেন্যান্ট আর্থার ব্যাসিল হর্সফল (Arthur Basil Horsfall) মরণোত্তর ভিক্টোরিয়া ক্রস (Victoria Cross) লাভ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৭১ সালের বিদ্রোহ এবং পরবর্তী গৃহযুদ্ধেও (১৯৮৩–২০০৯) সংগঠনের সাবেক সদস্য ও অফিসারদের অনেকে সশস্ত্র বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেছেন।

    ২. সাংগঠনিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়

    শ্রীলঙ্কা NCC পরিচালিত হয় দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (Ministry of Defence) অধীনে। এটি মূলত একটি স্বেচ্ছাসেবী স্কুলভিত্তিক ইউনিফর্মধারী যুব সংগঠন, যা শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ-ঐতিহ্য অনুসরণ করে পরিচালিত হয়।

    • সদর দপ্তর: ১৫ নং, দুতুগেমুনু স্ট্রিট, পামানকাডা, দেহিওয়ালা (Dehiwala), কলম্বো অঞ্চল।
    • প্রশাসনিক বিস্তৃতি: দেশজুড়ে ৯টি প্রাদেশিক সদর দপ্তর (Provincial Headquarters), একাধিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং ৩০-এর বেশি ব্যাটালিয়ন।
    • নেতৃত্ব: ১৯৮৮ সালে প্রথম NCC পরিচালক ছিলেন মেজর জেনারেল ই. জি. থেবানায়াগম (EG Thevanayagam)। সাম্প্রতিক সময়ে (২০২৫) পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল এপিসিআর প্রেমাথিলাকা (APCR Premathilaka)।

    সংগঠনটি মূলত ডিফেন্স (Defence) ও পুলিশ (Police) প্লাটুন—এই দুই ধারায় পরিচালিত হয়। ২০০৭ সালে নৌ ও বিমান শাখা (Naval & Air Force wings) চালু করা হলেও পরবর্তীতে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সেগুলো স্থগিত/পুনর্বিন্যস্ত করা হয় (প্রায় ২০২০)।

    ৩. লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মূলমন্ত্র

    শ্রীলঙ্কা NCC-এর মূলমন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয় “Discipline through Drill” (ড্রিলের মাধ্যমে শৃঙ্খলা)—যা ১৮৮১ সালে এই সংগঠনের সূচনার মূল ভাবনাটিকেই ধারণ করে। সংগঠনের ঘোষিত উদ্দেশ্য হলো কার্যকর প্রশিক্ষণ কারিকুলামের মাধ্যমে প্রতিটি স্কুল ক্যাডেটকে প্রশিক্ষিত ও অনুপ্রাণিত করা।

    এর মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম ও সুনাগরিকত্বের গুণাবলি গড়ে তোলা; শারীরিক সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি; এবং ভবিষ্যতে সশস্ত্র বাহিনীসহ জাতীয় সেবায় যোগদানের উপযোগী মানবসম্পদ তৈরি করা। ২০২৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে সংগঠনটিকে “President’s and Corps Colours” প্রদান করেন, যা জাতীয় স্বীকৃতির একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

    ৪. ক্যাডেট সংখ্যা ও বিস্তৃতি

    শ্রীলঙ্কা NCC দেশটির একটি বৃহৎ যুব সংগঠন। উন্মুক্ত সূত্রে সদস্য-সংখ্যার কিছুটা ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়—তাই একটি নির্দিষ্ট দাবি না করে এখানে পরিসর তুলে ধরা হলো (বানানো তথ্য পরিহার করে):

    • ক্যাডেট সংখ্যা: আনুমানিক ৮৫,০০০ থেকে ১,০০,০০০+ (বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন অনুমান; প্রতি বছর প্রায় ৯০,০০০–৯৫,০০০ ক্যাডেট প্রশিক্ষিত হয় বলে উল্লেখ করা হয়)।
    • অফিসার: ৩,০০০-এর বেশি।
    • ব্যাটালিয়ন: মোটামুটি ২৯টি ছেলেদের ও ৯টি মেয়েদের ব্যাটালিয়ন (সব মিলিয়ে ৩০-৩৮টি, সূত্রভেদে)।
    • প্লাটুন: সাড়ে চার হাজারের কাছাকাছি ক্যাডেট প্লাটুন (ডিফেন্স/পুলিশ ও ব্যান্ড মিলিয়ে)।

    মেয়েদের ক্যাডেটিং শুরু হয় ১৯৮৫ সালে, এবং ২০১৪ সালের মধ্যে আলাদা মেয়েদের ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়—যা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

    ৫. প্রশিক্ষণ, ক্যাম্প ও কার্যক্রম

    শ্রীলঙ্কা NCC-এর প্রশিক্ষণ কারিকুলাম মৌলিক সামরিক দক্ষতাকেন্দ্রিক। এর মধ্যে রয়েছে—শারীরিক সক্ষমতা (Physical Fitness), ফুট ড্রিল (Foot Drill), অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও ফায়ারিং (Weapon Training & Firing), ম্যাপ রিডিং (Map Reading), ফিল্ডক্রাফট (Field Craft) এবং প্রাথমিক চিকিৎসা (First Aid)। প্রশিক্ষণে T56 ধরনের অ্যাসল্ট রাইফেল ব্যবহার করা হয়।

    প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও ক্যাম্প:

    • রান্তম্বে প্রশিক্ষণকেন্দ্র (Rantambe) — ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত, প্রধান প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর একটি।
    • মুলাইতিভু প্রশিক্ষণকেন্দ্র (Mullaitivu) — ২০২৪ সালের এপ্রিলে চালু হওয়া নতুন কেন্দ্র।
    • দিয়াতালাওয়া (Diyatalawa) — ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্প অঞ্চল, বহু পুরোনো ক্যাডেট ক্যাম্পের স্থান।
    • প্রতিবছর ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে মূল্যায়নমূলক বার্ষিক ক্যাম্প (Annual Assessment Camps) অনুষ্ঠিত হয়।

    প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার: সেরা ছেলেদের প্লাটুনের জন্য হারমান লুস চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি (Hermann Loos Trophy)—যা ১৯১৭ সাল থেকে প্রদান করা হয়ে আসছে—এবং সেরা মেয়েদের প্লাটুনের জন্য ডি সোইসা চ্যালেঞ্জ ট্রফি (De Soysa Trophy) অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। এছাড়া আন্তঃপ্রাদেশিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও বার্ষিক শিবির সংগঠনের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ।

    ৬. র‍্যাঙ্ক, সার্টিফিকেট ও সুযোগ-সুবিধা

    র‍্যাঙ্ক কাঠামো: শ্রীলঙ্কা NCC-এর র‍্যাঙ্ক ব্যবস্থা মূলত শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনীর প্যাটার্ন অনুসরণ করে। ক্যাডেট পর্যায়ে ধাপে ধাপে ল্যান্স কর্পোরাল, কর্পোরাল, সার্জেন্ট, স্টাফ সার্জেন্ট ও ওয়ারেন্ট অফিসার পর্যন্ত পদোন্নতি হয়; অফিসার পর্যায়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থেকে শুরু করে ক্যাপ্টেন, মেজর, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পর্যন্ত পদ রয়েছে।

    সার্টিফিকেট: ভারত বা বাংলাদেশের মতো সুস্পষ্ট “A/B/C সার্টিফিকেট” স্তরভিত্তিক ব্যবস্থার তথ্য শ্রীলঙ্কা NCC সম্পর্কে উন্মুক্ত সূত্রে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না; বরং প্রশিক্ষণের অগ্রগতি মূলত বার্ষিক মূল্যায়ন ক্যাম্প ও দক্ষতা-ভিত্তিক পদোন্নতির মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়। (সততার স্বার্থে: নির্দিষ্ট সার্টিফিকেট-স্তর সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় এখানে কোনো দাবি করা হলো না।)

    সুযোগ-সুবিধা: ঐতিহ্যগতভাবে NCC শ্রীলঙ্কার নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীতে অফিসার নিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত। শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও আত্মবিশ্বাস গঠনের পাশাপাশি জাতীয় অনুষ্ঠান, ক্রীড়া ও আন্তর্জাতিক যুব বিনিময় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়া যায়।

    ৭. বিএনসিসির সাথে তুলনা

    শ্রীলঙ্কা NCC এবং বাংলাদেশের বিএনসিসি (BNCC)—উভয়ই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ক্যাডেট ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত এবং উভয়ই নিজ নিজ দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত স্বেচ্ছাসেবী যুব সংগঠন। তবে কিছু উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও রয়েছে:

    বিষয়শ্রীলঙ্কা NCCবাংলাদেশ বিএনসিসি (BNCC)
    সূচনা১৮৮১ (রয়্যাল কলেজ, কলম্বো)১৯২৩ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে UTC); বিএনসিসি রূপে ১৯৭৯
    নিয়ন্ত্রণপ্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়
    মূলমন্ত্র“Discipline through Drill”“জ্ঞান ও শৃঙ্খলা” (প্রাণসত্তা: “The Volunteers”)
    শাখামূলত ডিফেন্স ও পুলিশ প্লাটুনত্রি-বাহিনী ভিত্তিক: সেনা, নৌ ও বিমান শাখা
    সদস্য স্তরমূলত স্কুল পর্যায়স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় (জুনিয়র ও সিনিয়র ডিভিশন)
    সার্টিফিকেটস্পষ্ট A/B/C স্তরের তথ্য উন্মুক্ত সূত্রে নেইপদোন্নতি পরীক্ষা ও সার্টিফিকেটভিত্তিক কাঠামো

    লক্ষণীয়, শ্রীলঙ্কা NCC মূলত স্কুল-পর্যায়ে সীমাবদ্ধ হলেও এর ইতিহাস বিএনসিসির চেয়েও পুরোনো। অন্যদিকে বিএনসিসির ত্রি-বাহিনী কাঠামো (সেনা, নৌ, বিমান) এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃতি একে একটি বিস্তৃততর কাঠামো দিয়েছে। উভয় সংগঠনই সার্কভুক্ত অঞ্চলে শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব গঠনের অভিন্ন দর্শন ধারণ করে।

    ৮. তথ্যসূত্র

    ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত ও সম্পাদিত: ক্যাপ্টেন মুহম্মদ জিয়াউর রহমান, বিএনসিসি অফিসার। — https://bncc.work

    (সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজের চতুর্থ পর্ব। পরবর্তী পর্বে থাকছে মালদ্বীপের Maldives National Cadet Corps।)

  • সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ (পর্ব ৩): পাকিস্তান — National Cadet Corps (NCC)

    সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ (পর্ব ৩): পাকিস্তান — National Cadet Corps (NCC)

    সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজের তৃতীয় পর্বে আমরা তুলে ধরছি প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (National Cadet Corps, NCC) ও এর সাথে সম্পর্কিত জাতীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা। উল্লেখ্য, ভারত ও বাংলাদেশের বিপরীতে পাকিস্তানের এই ক্যাডেট ব্যবস্থাটি বর্তমানে বিলুপ্ত — তাই এই পর্বটি মূলত একটি ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পর্যালোচনা।

    ভূমিকা ও ঐতিহাসিক পটভূমি

    ভারতবর্ষে ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা University Officers’ Training Corps (UOTC) ও Army Cadet Force-এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর নবগঠিত পাকিস্তানও ছাত্রদের সামরিক ধাঁচের প্রশিক্ষণের একটি কাঠামো গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়। ১৯৪৭ সালে একটি সরকারি কমিটি এর প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করে এবং প্রায় ১৯৪৮ সালের দিকে ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর যাত্রা শুরু করে; ১৯৫০ সালের সেপ্টেম্বরে এটি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। ব্রিটেনের Officers’ Training Corps ও Army Cadet Force-এর আদলে গড়ে তোলা এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল কলেজ পর্যায়ের ছাত্রদের নেতৃত্ব ও প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া।

    প্রাথমিক পর্যায়ে NCC মূলত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে কার্যক্রম চালাত। ১৯৫২ সালের দিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও (বর্তমান বাংলাদেশ) এটি সম্প্রসারণের কথা বিবেচিত হয়েছিল, তবে তা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছিল তা নিয়ে তথ্য সীমিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের NCC-কে ন্যাশনাল গার্ড (National Guard)-এর সাথে একীভূত করা হয়।

    সাংগঠনিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ

    পাকিস্তানের NCC কোনো স্বতন্ত্র বেসামরিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে না থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে, রিজার্ভ বাহিনী ন্যাশনাল গার্ডের একটি অঙ্গ হিসেবে পরিচালিত হতো। ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল গার্ড ছিল সেনাবাহিনীর একটি "দ্বিতীয় সারির প্রতিরক্ষা" (second line of defence) কাঠামো, যা সেনাপ্রধানের (Chief of Army Staff) অধীনে GHQ, রাওয়ালপিন্ডি থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো।

    এই কাঠামোতে কলেজভিত্তিক ব্যাটালিয়ন গঠন করা হতো, যেখানে ছাত্ররা ক্যাডেট এবং কলেজের শিক্ষক/কর্মকর্তারা অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। ১৯৬০ সালের একটি কমিশন সংগঠনটিকে আরও সুসংগঠিত করতে সেনাবাহিনীর অধীনে একটি পৃথক ডিরেক্টরেট গঠনের সুপারিশ করেছিল। বর্তমানে ন্যাশনাল গার্ডের সক্রিয় অঙ্গ হলো মুজাহিদ ফোর্স (Mujahid Force) ও জানবাজ ফোর্স (Janbaz Force); NCC ও পূর্বতন উইমেন’স ন্যাশনাল গার্ড আর সক্রিয় নেই।

    লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মূলমন্ত্র

    NCC-এর মূল লক্ষ্য ছিল কলেজ ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের তরুণদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম ও প্রাথমিক সামরিক দক্ষতা গড়ে তোলা এবং জরুরি প্রয়োজনে একটি প্রশিক্ষিত রিজার্ভ জনশক্তি তৈরি করা। কলেজ ব্যাটালিয়নের মাধ্যমে ছাত্রদের সামরিক ধাঁচের প্রশিক্ষণ দেওয়াই ছিল এর কেন্দ্রীয় ভাবনা।

    সততার সাথে উল্লেখ্য: ভারত ও বাংলাদেশের ক্যাডেট কোরের মতো পাকিস্তানের NCC-এর একটি সুনির্দিষ্ট, ব্যাপকভাবে প্রচারিত "মূলমন্ত্র" (motto) সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য উন্মুক্ত তথ্য সীমিত। তাই এখানে কোনো নির্দিষ্ট মূলমন্ত্র দাবি করা হচ্ছে না — এ বিষয়ে যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে হালনাগাদ করা হবে।

    ক্যাডেট সংখ্যা ও বিস্তৃতি

    সংগঠনটির সম্প্রসারণের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ১৯৬০ সালের মধ্যে প্রায় ২০,০০০ সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৭ সাল নাগাদ পাকিস্তানের অধিকাংশ ডিগ্রি কলেজে NCC কার্যক্রম চালু ছিল বলে জানা যায়। তবে বিভিন্ন সময়ের সঠিক সদস্য-সংখ্যা নিয়ে বিস্তারিত ও হালনাগাদ পরিসংখ্যান উন্মুক্ত উৎসে সীমিত; তাই এখানে অনুমাননির্ভর কোনো সংখ্যা দেওয়া হলো না।

    প্রশিক্ষণ, ক্যাম্প ও কার্যক্রম

    NCC-এর প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত ছিল বার্ষিক সামরিক ধাঁচের ক্যাম্প, ড্রিল ও প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ। ১৯৭৩ সালের ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী সুস্থ-সবল পুরুষ কলেজ-ছাত্র ও কলেজ-কর্মকর্তারা এতে যুক্ত হতে পারতেন এবং সদস্য হিসেবে তাঁরা সামরিক আইনের (military law) আওতাভুক্ত থাকতেন। কলেজ ব্যাটালিয়নভিত্তিক কাঠামোয় শৃঙ্খলা, শারীরিক সক্ষমতা ও নেতৃত্ব বিকাশই ছিল কার্যক্রমের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

    র‍্যাঙ্ক, সার্টিফিকেট ও সুযোগ-সুবিধা

    NCC সম্পন্নকারীদের জন্য উল্লেখযোগ্য একটি সুবিধা ছিল সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকারমূলক বিবেচনা। তবে ভারতের NCC-এর ‘A/B/C’ সার্টিফিকেট ব্যবস্থা কিংবা বাংলাদেশের বিএনসিসির নির্দিষ্ট পদোন্নতি ও সার্টিফিকেট কাঠামোর মতো পাকিস্তানের NCC-এর র‍্যাঙ্ক ও সার্টিফিকেট ব্যবস্থার বিস্তারিত ও যাচাইযোগ্য বিবরণ উন্মুক্ত উৎসে সহজলভ্য নয়। এই বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য এড়াতে আমরা এখানে কোনো নির্দিষ্ট সার্টিফিকেট-স্তর দাবি করছি না।

    বর্তমান অবস্থা: বিলুপ্তি ও পুনঃপ্রবর্তনের আলোচনা

    পাকিস্তানের NCC ২০০২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের সময় বিলুপ্ত করা হয়। এরপর ২০১৪ সালে পেশোয়ারের স্কুলে সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে সংগঠনটি পুনরায় চালুর কথা বিবেচিত হয়। ২০১৫ সালে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এবং ২০১৯ সালে প্রাদেশিক পর্যায়ে NCC পুনঃপ্রবর্তনের দাবি ও আলোচনা উঠলেও, দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গভাবে এটি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে — এমন নিশ্চিত তথ্য এখনো নেই।

    বিভ্রান্তি এড়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য: পাকিস্তানের বহুল পরিচিত "ক্যাডেট কলেজ" (Cadet Colleges) — যেমন হাসান আবদাল, পেটারো, ঘোটকি ইত্যাদি — এই NCC থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ক্যাডেট কলেজগুলো হলো আবাসিক সামরিক-ধাঁচের মাধ্যমিক/উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর NCC ছিল সাধারণ কলেজ-ছাত্রদের জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবী সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। দুটিকে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।

    বিএনসিসির সাথে তুলনা

    বাংলাদেশ ও পাকিস্তান — উভয় দেশের ক্যাডেট ব্যবস্থারই শিকড় প্রোথিত অভিন্ন ব্রিটিশ-ভারতীয় UOTC ঐতিহ্যে। কিন্তু স্বাধীনতার পর দুই দেশের পথ ভিন্ন হয়ে যায়:

    বিষয়পাকিস্তান NCCবাংলাদেশ বিএনসিসি
    বর্তমান অবস্থাবিলুপ্ত (২০০২)সক্রিয় ও ক্রমবর্ধমান
    নিয়ন্ত্রণসেনাবাহিনী / ন্যাশনাল গার্ডপ্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়
    স্তরমূলত কলেজ পর্যায়স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়
    শাখামূলত সেনা-ধাঁচ (স্থল)ত্রি-বাহিনী: সেনা, নৌ ও বিমান
    নারী অন্তর্ভুক্তিসীমিত (পুরুষকেন্দ্রিক নীতিমালা)পুরুষ ও নারী উভয় প্লাটুন
    মূলমন্ত্রসুনির্দিষ্ট তথ্য সীমিত"জ্ঞান ও শৃঙ্খলা"

    এই তুলনা থেকে স্পষ্ট, বাংলাদেশ যেখানে বিএনসিসিকে একটি সক্রিয়, ত্রি-বাহিনীভিত্তিক ও ক্রমবর্ধমান স্বেচ্ছাসেবী রিজার্ভ সংগঠন হিসেবে ধারাবাহিকভাবে বিকশিত করেছে, সেখানে পাকিস্তানে এই ধারার প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্র-ক্যাডেট ব্যবস্থাটি কার্যত থেমে গেছে। আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বিএনসিসির ধারাবাহিকতা ও সম্প্রসারণ তাই একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।

    তথ্যসূত্র

    দ্রষ্টব্য: পাকিস্তানের NCC বর্তমানে বিলুপ্ত থাকায় সরকারি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট-ভিত্তিক হালনাগাদ তথ্য সীমিত। তাই কিছু ক্ষেত্রে (যেমন মূলমন্ত্র, সার্টিফিকেট-স্তর ও সাম্প্রতিক সদস্য-সংখ্যা) সততার সাথে অনিশ্চয়তা উল্লেখ করা হয়েছে; বানানো বা অনুমাননির্ভর তথ্য পরিহার করা হয়েছে।


    ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত ও সম্পাদিত: ক্যাপ্টেন মুহম্মদ জিয়াউর রহমান, বিএনসিসি অফিসার। — https://bncc.work

  • সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ (পর্ব ২): ভারত — National Cadet Corps (NCC)

    সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ (পর্ব ২): ভারত — National Cadet Corps (NCC)

    সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ — পর্ব ২। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ও প্রাচীনতম যুব সামরিক প্রশিক্ষণ সংগঠন ভারতের ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (National Cadet Corps, সংক্ষেপে NCC)। এই পর্বে আমরা ভারতের এনসিসির ইতিহাস, সাংগঠনিক কাঠামো, লক্ষ্য, প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেট ব্যবস্থা তুলে ধরব এবং সবশেষে বাংলাদেশের বিএনসিসির সাথে তুলনামূলক পর্যালোচনা করব।

    ভূমিকা ও ঐতিহাসিক পটভূমি

    ভারতের ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (NCC) হলো দেশটির স্কুল ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গঠিত একটি স্বেচ্ছাসেবী, ত্রি-বাহিনী ভিত্তিক যুব সংগঠন। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ১৬ জুলাই ১৯৪৮ সালে, ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর অ্যাক্ট, ১৯৪৮ (NCC Act XXXI of 1948)-এর অধীনে। এর সদর দপ্তর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থিত।

    এনসিসির শিকড় ব্রিটিশ আমলের কয়েকটি পূর্বসূরি সংগঠনের মধ্যে প্রোথিত। ১৯১৭ সালের ইন্ডিয়ান ডিফেন্স অ্যাক্টের অধীনে গঠিত হয় “ইউনিভার্সিটি কোর” (University Corps); ১৯২০ সালে এটি রূপান্তরিত হয় “ইউনিভার্সিটি ট্রেনিং কোর” (University Training Corps)-এ এবং ১৯৪২ সালে এর নামকরণ হয় “ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ট্রেনিং কোর” (University Officers Training Corps)। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে এইসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ১৯৪৮ সালে আধুনিক এনসিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে গার্লস ডিভিশন (Girls Division) এবং ১৯৫০ সালে বিমান শাখা (Air Wing) যুক্ত হয়ে সংগঠনটি পূর্ণাঙ্গ ত্রি-বাহিনী রূপ লাভ করে।

    সাংগঠনিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়

    ভারতের এনসিসি পরিচালিত হয় দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (Ministry of Defence) অধীনে। সংগঠনটির সর্বোচ্চ প্রধান হলেন মহাপরিচালক (Director General, DG), যিনি সাধারণত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (Lieutenant General) পদমর্যাদার একজন সামরিক কর্মকর্তা।

    সংগঠনটি তিনটি বাহিনী-শাখা বা উইং নিয়ে গঠিত:

    • আর্মি উইং (Army Wing) — স্থল সেনাবাহিনী ভিত্তিক প্রশিক্ষণ;
    • নেভাল উইং (Naval Wing) — নৌবাহিনী ভিত্তিক প্রশিক্ষণ;
    • এয়ার উইং (Air Wing) — বিমান বাহিনী ভিত্তিক প্রশিক্ষণ।

    দেশজুড়ে সমন্বয়ের জন্য রাজ্য ও অঞ্চলভিত্তিক ডিরেক্টরেট (State/Regional NCC Directorate) এবং তার অধীনে গ্রুপ হেডকোয়ার্টার ও ইউনিট রয়েছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম মূলত পরিচালনা করেন নিয়মিত বাহিনীর কর্মকর্তা এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকে কমিশনপ্রাপ্ত অ্যাসোসিয়েট এনসিসি অফিসার (Associate NCC Officer, ANO)গণ।

    লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মূলমন্ত্র

    ভারতের এনসিসির মূলমন্ত্র (Motto) হলো “একতা ও শৃঙ্খলা” (Unity and Discipline), যা আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় ১৯৮০ সালের ১২ অক্টোবর।

    সংগঠনটির ঘোষিত তিনটি প্রধান লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হলো:

    1. দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে চরিত্র, সহমর্মিতা, সেবার আদর্শ ও নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে তোলা;
    2. যুবসমাজকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশরক্ষায় আগ্রহী ও উদ্বুদ্ধ করে তোলা;
    3. জাতীয় জরুরি অবস্থায় সশস্ত্র বাহিনীর দ্রুত সম্প্রসারণে সহায়ক একটি প্রশিক্ষিত রিজার্ভ (reserve) গড়ে তোলা।

    উল্লেখ্য, এনসিসি সরাসরি সেনা নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয় না; বরং এটি নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও নাগরিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার একটি চরিত্রগঠনমূলক প্ল্যাটফর্ম।

    ক্যাডেট সংখ্যা ও বিস্তৃতি

    ভারতের এনসিসি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইউনিফর্মধারী যুব সংগঠন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী এর ক্যাডেট সংখ্যা আনুমানিক ১৭ লক্ষ থেকে ২৩ লক্ষ (প্রায় ১.৭–২.৩ মিলিয়ন)। এই বিপুল সংখ্যক ক্যাডেট সারা ভারতের হাজার হাজার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে আছে। ছেলে ও মেয়ে উভয়ই এই সংগঠনে অংশগ্রহণ করে এবং জুনিয়র (স্কুল পর্যায়) ও সিনিয়র (কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়) — উভয় ডিভিশনেই কার্যক্রম বিস্তৃত।

    প্রশিক্ষণ, ক্যাম্প ও কার্যক্রম

    এনসিসির প্রশিক্ষণ কার্যক্রম মূলত দুই ভাগে বিভক্ত — প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ (Institutional Training) এবং ক্যাম্প প্রশিক্ষণ (Camp Training)। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের আওতায় থাকে ড্রিল ও কুচকাওয়াজ, ম্যাপ রিডিং, ফিল্ডক্রাফট, অস্ত্র পরিচিতি ও ছোট অস্ত্রের ফায়ারিং, শারীরিক প্রশিক্ষণ, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং নেতৃত্ব বিকাশমূলক নানা কার্যক্রম।

    ক্যাম্প প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে বার্ষিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প (Annual Training Camp, ATC), কম্বাইন্ড অ্যানুয়াল ট্রেনিং ক্যাম্প (CATC), নৌ ও বিমান শাখার বিশেষায়িত ক্যাম্প, ট্রেকিং ও অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্প প্রভৃতি। সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর একটি হলো প্রতি বছর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত রিপাবলিক ডে ক্যাম্প (Republic Day Camp, RDC), যেখানে সারা দেশ থেকে বাছাইকৃত ক্যাডেটরা অংশ নেয় এবং প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সেবা, বৃক্ষরোপণ, রক্তদান ও সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রমেও এনসিসি ক্যাডেটরা নিয়মিত অংশ নেয়।

    আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এনসিসির উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি হলো ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম (Youth Exchange Programme, YEP), যার মাধ্যমে প্রতি বছর শতাধিক ক্যাডেট বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোতে বিনিময় সফরে যায়। এই তালিকায় সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, মরিশাস, ভিয়েতনাম, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, রাশিয়াসহ বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত — যা এই সিরিজের আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোচনার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।

    র‍্যাঙ্ক, সার্টিফিকেট ও সুযোগ-সুবিধা

    এনসিসিতে ক্যাডেটরা প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিভিন্ন র‍্যাঙ্ক অর্জন করে; সিনিয়র ডিভিশনে যেমন—ল্যান্স কর্পোরাল, কর্পোরাল, সার্জেন্ট, আন্ডার অফিসার ও সিনিয়র আন্ডার অফিসার। মূল্যায়ন ও সনদপ্রাপ্তির জন্য রয়েছে তিন স্তরের সার্টিফিকেট পরীক্ষা:

    • সার্টিফিকেট ‘এ’ (Certificate A): জুনিয়র ডিভিশন/উইং-এর ক্যাডেটদের জন্য (সাধারণত ৮ম–১০ম শ্রেণি); নির্দিষ্ট উপস্থিতি ও একটি বার্ষিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আবশ্যক।
    • সার্টিফিকেট ‘বি’ (Certificate B): সিনিয়র ডিভিশন/উইং-এর ক্যাডেটদের জন্য (দশম শ্রেণির পর); নির্দিষ্ট উপস্থিতি ও একটি বার্ষিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আবশ্যক।
    • সার্টিফিকেট ‘সি’ (Certificate C): সর্বোচ্চ স্তরের সনদ, সাধারণত প্রশিক্ষণের তৃতীয় বর্ষে অর্জিত হয়; এর জন্য একাধিক (সাধারণত দুটি) বার্ষিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প বা সমমানের বিশেষায়িত ক্যাম্প প্রয়োজন।

    এই সার্টিফিকেটগুলো, বিশেষত ‘সি’ সার্টিফিকেট, ভারতে সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা ও অগ্রাধিকার এনে দেয়। এর পাশাপাশি ক্যাডেটরা নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা, শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস ও দেশপ্রেমের মতো আজীবন-উপযোগী গুণাবলি অর্জন করে।

    বিএনসিসির সাথে তুলনা

    বাংলাদেশের বিএনসিসি (Bangladesh National Cadet Corps) এবং ভারতের এনসিসি — উভয়েরই আদর্শগত ভিত্তি এক: ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেম গড়ে তোলা। উভয় সংগঠনই ত্রি-বাহিনী ভিত্তিক (সেনা, নৌ ও বিমান শাখা) এবং উভয়ই নিজ নিজ দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত। এমনকি দুই সংগঠনেরই পূর্বসূরি ছিল ব্রিটিশ আমলের ‘ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ট্রেনিং কোর’ ধারার সংগঠন — ফলে ঐতিহাসিক শিকড়ও অভিন্ন।

    তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। ভারতের এনসিসি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালে, আর বিএনসিসি স্বাধীন বাংলাদেশে বর্তমান রূপে সংগঠিত হয় ১৯৭৯ সালের ২৩ মার্চ — যখন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ট্রেনিং কোর, বাংলাদেশ ক্যাডেট কোর ও জুনিয়র ক্যাডেট কোরকে একীভূত করেন। মূলমন্ত্রেও পার্থক্য স্পষ্ট: এনসিসির মূলমন্ত্র “একতা ও শৃঙ্খলা”, আর বিএনসিসির মূলমন্ত্র “জ্ঞান ও শৃঙ্খলা” এবং প্রাণসত্তা “দ্য ভলান্টিয়ার্স” (The Volunteers)।

    সবচেয়ে বড় পার্থক্য পরিসরে। ভারতের বিশাল জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বিস্তৃতির কারণে এনসিসির ক্যাডেট সংখ্যা প্রায় ১৭–২৩ লক্ষ, যা বিএনসিসির তুলনায় বহুগুণ বেশি। তবে সংখ্যাগত এই পার্থক্য সত্ত্বেও প্রশিক্ষণের কাঠামো, ক্যাম্প ব্যবস্থা ও সার্টিফিকেট ধারণা (বি ও সি সার্টিফিকেট) উভয় দেশে অনেকটা সমান্তরাল। আঞ্চলিক সহযোগিতার দিক থেকেও দুই সংগঠন সংযুক্ত — ভারতের ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে বাংলাদেশ একটি অংশগ্রহণকারী দেশ।

    তথ্যসূত্র

    ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত ও সম্পাদিত: ক্যাপ্টেন মুহম্মদ জিয়াউর রহমান, বিএনসিসি অফিসার। — https://bncc.work

  • সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ (পর্ব ১): সার্কভুক্ত দেশগুলোর ক্যাডেট কোর — এক নজরে তুলনামূলক পরিচিতি

    এই লেখাটি bncc.work-এর একটি বিশেষ ধারাবাহিক আয়োজন — “সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ”-এর প্রথম পর্ব। সার্কভুক্ত (SAARC) দেশগুলোর ছাত্র/ক্যাডেট কোর নিয়ে ধারাবাহিকভাবে নির্ভুল ও তথ্যসূত্র-নির্ভর আলোচনা করাই এই সিরিজের উদ্দেশ্য, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিএনসিসির অবস্থানকে আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরবে।

    ভূমিকা: ক্যাডেট কোর কী এবং কেন

    ক্যাডেট কোর (Cadet Corps) হলো স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম ও প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণের বীজ বপন করার একটি স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচি। এর মূল লক্ষ্য কাউকে সরাসরি সৈনিক বানানো নয়, বরং তরুণদের সুশৃঙ্খল, দায়িত্ববান ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং জাতীয় প্রতিরক্ষার একটি “দ্বিতীয় সারি” (second line of defence) তৈরি করা।

    দক্ষিণ এশিয়ায় ক্যাডেট প্রশিক্ষণের ধারণাটির শিকড় প্রোথিত ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে স্কুলপর্যায়ে “ড্রিলের মাধ্যমে শৃঙ্খলা” শেখানোর যে চর্চা শুরু হয়েছিল, স্বাধীনতা-উত্তরকালে সার্কভুক্ত প্রায় প্রতিটি দেশ তা নিজেদের জাতীয় প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন রূপে সাজিয়ে নিয়েছে। ফলে আজ এই অঞ্চলে ক্যাডেট কোরের রূপ, আকার ও পরিচালন-কাঠামোতে যেমন মিল আছে, তেমনি উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও রয়েছে।

    সার্কভুক্ত আট দেশের ক্যাডেট কোর: এক নজরে

    সার্কের (South Asian Association for Regional Cooperation) সদস্য দেশ আটটি — ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ। নিচে প্রতিটি দেশের ক্যাডেট/যুব সামরিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হলো।

    ১. ভারত — National Cadet Corps (NCC)

    ভারতের ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (NCC) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ১৬ জুলাই এবং এটি বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম ইউনিফর্মধারী যুব সংগঠন হিসেবে বিবেচিত। এটি ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেনা, নৌ ও বিমান — এই তিন বাহিনীর উইং নিয়ে গঠিত। এর মূলমন্ত্র “একতা ও শৃঙ্খলা” (Unity and Discipline / एकता और अनुशासन)। আনুমানিক প্রায় ১৭ থেকে ২৩ লক্ষ ক্যাডেট এতে সক্রিয়। ক্যাডেটরা ‘A’, ‘B’ ও ‘C’ সার্টিফিকেট অর্জন করে, যা উচ্চশিক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদানে বিশেষ সুবিধা দেয়। সদর দপ্তর নয়াদিল্লিতে এবং এটি একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদমর্যাদার মহাপরিচালকের (Director General) নেতৃত্বে পরিচালিত।

    ২. পাকিস্তান — National Cadet Corps (বর্তমানে বিলুপ্ত)

    পাকিস্তানে ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫০-এর দশকের গোড়ায় (১৯৪৭-৪৮ সালে প্রস্তুতিমূলক কমিটি গঠন এবং ১৯৫০ সালে সরকারি অনুমোদন)। কলেজ ও স্কুল পর্যায়ে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এটি পরিচালিত হতো এবং জাতীয় গার্ডের (National Guard) একটি রিজার্ভ অংশ ছিল। তবে ২০০২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের সময়ে এটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং এখনো তা কার্যত অকার্যকর। ২০১৪ সালের পেশোয়ার স্কুল হামলার পর এবং পরবর্তীতে ২০১৫ ও ২০১৯ সালে এটি পুনরুজ্জীবনের নানা প্রস্তাব উঠলেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না।

    ৩. শ্রীলঙ্কা — National Cadet Corps (অঞ্চলের প্রাচীনতম)

    শ্রীলঙ্কার ক্যাডেট কোরের ইতিহাস এই অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো — এর সূচনা ১৮৮১ সালে কলম্বোর রয়্যাল কলেজে একটি ক্যাডেট প্লাটুন গঠনের মধ্য দিয়ে। কালক্রমে নাম বদলে হয়েছে Ceylon Cadet Battalion (১৯১৯), Ceylon Cadet Corps (১৯৫০), Sri Lanka Cadet Corps (১৯৭২) এবং সর্বশেষ ১৯৮৮ সাল থেকে National Cadet Corps। এটি শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। এর মূলমন্ত্র “কখনো অপ্রস্তুত থেকো না” (Never be unprepared)। প্রায় ১ লক্ষ নিবন্ধিত ক্যাডেট, ৪,৪৯২টি প্লাটুন ও ৩০টি ব্যাটালিয়নে বিস্তৃত।

    ৪. মালদ্বীপ — Maldives National Cadet Corps (MNCC)

    মালদ্বীপ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের সূচনা ১৯৪৫ সালের একটি প্রশিক্ষণ দল থেকে হলেও বর্তমান রূপে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে MNCC নামে যাত্রা শুরু করে ১৯৯৫ সালে। এটি মূলত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এবং মালদ্বীপ ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স (MNDF) এতে সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ সহায়তা দেয়। এর মূলমন্ত্র “আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা” (To obey and to be loyal)। দেশের প্রায় ৪১টি স্কুলে সক্রিয় এই সংগঠনটিকে মালদ্বীপের বৃহত্তম যুব সংগঠন হিসেবে অভিহিত করা হয় এবং এটি চারটি আঞ্চলিক রেজিমেন্টে বিভক্ত।

    ৫. নেপাল — National Cadet Corps (NCC)

    নেপালের ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৫ সালের ৭ নভেম্বর, রাজা মহেন্দ্রের অনুমোদনক্রমে। এটি নেপাল আর্মি কর্তৃক পরিচালিত একটি সরকারি যুব নেতৃত্ব ও জাতীয় সেবা কর্মসূচি। প্রোগ্রামটি অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে জুনিয়র ও সিনিয়র ডিভিশনে বিভক্ত। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৮৬,০০০-এরও বেশি শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে এবং বছরে প্রায় ৭,৭০০ ক্যাডেট অংশ নেয়। সম্প্রতি ১৯৭০ সালের পুরোনো আইন প্রতিস্থাপন করে কর্মসূচিটি সম্প্রসারণের জন্য নতুন একটি বিল সংসদে উত্থাপিত হয়েছে, যার আওতায় এটি নেপালের সব ৭৭টি জেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

    ৬. ভুটান — আনুষ্ঠানিক ক্যাডেট কোর নেই, তবে জাতীয় সেবা কর্মসূচি চালু

    ভুটানে ভারত-বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার মতো ধারাবাহিক স্কুল-পর্যায়ের “ক্যাডেট কোর” কাঠামো প্রচলিত নেই — এ তথ্য সততার সাথে উল্লেখ করা প্রয়োজন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভুটান “গেলসুং” (Gyalsung) জাতীয় সেবা কর্মসূচি চালু করেছে, যা ২০২৪ সাল থেকে কার্যকর হয়েছে। এর আওতায় নির্দিষ্ট বয়সে (মূলত ১৮ বছর) তরুণ-তরুণীদের বাধ্যতামূলক মৌলিক সামরিক ও জীবন-দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা রয়্যাল ভুটান আর্মির সহায়তায় পরিচালিত। কাঠামোগতভাবে এটি স্কুল-ক্যাডেট মডেলের চেয়ে ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্যের দিক থেকে তুলনীয়।

    ৭. আফগানিস্তান — আনুষ্ঠানিক স্কুল ক্যাডেট কোরের অনুপস্থিতি

    আফগানিস্তানে ভারত বা বাংলাদেশের ধাঁচে স্কুল/কলেজভিত্তিক কোনো জাতীয় ক্যাডেট কোর নেই। দেশটিতে সামরিক প্রশিক্ষণ মূলত ন্যাশনাল মিলিটারি একাডেমি অব আফগানিস্তানের মতো উচ্চতর সামরিক প্রতিষ্ঠান-কেন্দ্রিক থেকেছে, যা তরুণ শিক্ষার্থীদের সাধারণ ক্যাডেট কর্মসূচি নয়। এছাড়া ২০২১ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশটির প্রতিরক্ষা ও যুব-প্রশিক্ষণ কাঠামোর সাম্প্রতিক অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য সীমিত। তাই এখানে অনুমাননির্ভর কোনো দাবি না করে বলা যায় — সার্কভুক্ত অন্য দেশগুলোর মতো আনুষ্ঠানিক ছাত্র-ক্যাডেট কোরের অস্তিত্ব আফগানিস্তানে দৃশ্যমান নয়।

    ৮. বাংলাদেশ — Bangladesh National Cadet Corps (BNCC)

    বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় ১৯৭৯ সালের ২৩ মার্চ, পূর্বসূরি কয়েকটি সংগঠনের সমন্বয়ে। এটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেনা, নৌ ও বিমান — এই তিন উইং নিয়ে গঠিত একটি ত্রি-বাহিনীভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী রিজার্ভ বাহিনী। এর মূলমন্ত্র “জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও একতা” (Knowledge, Discipline and Unity)। সদর দপ্তর ঢাকার উত্তরায়; সেনা উইং পাঁচটি রেজিমেন্টে (রমনা, কর্ণফুলী, ময়নামতি, মহাস্থান ও সুন্দরবন) বিভক্ত। এই সিরিজের অষ্টম পর্বে বিএনসিসি নিয়ে বিস্তারিত ও তুলনামূলক আলোচনা করা হবে।

    তুলনামূলক সারণি

    দেশসংগঠনপ্রতিষ্ঠানিয়ন্ত্রণবর্তমান অবস্থা
    ভারতNational Cadet Corps (NCC)১৯৪৮প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (তিন বাহিনী)সক্রিয় — বিশ্বের বৃহত্তম (~১৭–২৩ লক্ষ)
    পাকিস্তানNational Cadet Corps~১৯৫০সেনাবাহিনী / ন্যাশনাল গার্ড২০০২ সালে বিলুপ্ত; পুনরুজ্জীবনের আলোচনা
    শ্রীলঙ্কাNational Cadet Corpsমূল ১৮৮১; বর্তমান নাম ১৯৮৮প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সক্রিয় — অঞ্চলের প্রাচীনতম (~১ লক্ষ)
    মালদ্বীপMaldives National Cadet Corps১৯৯৫ (উৎস ১৯৪৫)শিক্ষা মন্ত্রণালয় + MNDFসক্রিয় (~৪১টি স্কুল)
    নেপালNational Cadet Corps১৯৬৫নেপাল আর্মিসক্রিয় — সম্প্রসারণাধীন (বছরে ~৭,৭০০)
    ভুটানGyalsung (জাতীয় সেবা)২০২৪সরকার / রয়্যাল ভুটান আর্মিস্কুল-ক্যাডেট কোর নেই; নতুন জাতীয় সেবা
    আফগানিস্তান———আনুষ্ঠানিক ছাত্র-ক্যাডেট কোর নেই
    বাংলাদেশBangladesh National Cadet Corps (BNCC)১৯৭৯প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (তিন বাহিনী)সক্রিয় — ত্রি-বাহিনীভিত্তিক
    সার্কভুক্ত দেশগুলোর ক্যাডেট কোরের তুলনামূলক সারসংক্ষেপ (তথ্যসূত্র নিচে উল্লিখিত)।

    কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ

    • নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষে ভিন্নতা: ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে ক্যাডেট কোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে; নেপালে সরাসরি সেনাবাহিনী পরিচালনা করে; আবার মালদ্বীপে এটি প্রধানত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে।
    • ইতিহাসের বিস্তৃতি: শ্রীলঙ্কা (১৮৮১) ও ভারত (১৯৪৮) সবচেয়ে পুরোনো ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুদৃঢ়; বাংলাদেশ (১৯৭৯) তুলনামূলক নবীন হলেও কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী।
    • ধারাবাহিকতা বনাম বিচ্ছিন্নতা: ভারত, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও মালদ্বীপে ক্যাডেট কোর ধারাবাহিকভাবে সক্রিয়; পাকিস্তানে তা ২০০২ সালে বিলুপ্ত হয়েছে; ভুটান ও আফগানিস্তানে প্রচলিত অর্থে স্কুল-ক্যাডেট কোর নেই।
    • অভিন্ন লক্ষ্য: নাম, আকার ও কাঠামো ভিন্ন হলেও প্রায় সবগুলোর মূল উদ্দেশ্য অভিন্ন — তরুণদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম ও সেবার মানসিকতা গড়ে তোলা।

    আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বিএনসিসি

    এই তুলনামূলক চিত্রে বাংলাদেশের বিএনসিসির অবস্থান বেশ শক্তিশালী। ভারতের NCC-র মতো বিএনসিসিও ত্রি-বাহিনীভিত্তিক (সেনা, নৌ, বিমান) এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সুসংগঠিত। ভৌগোলিক আকার ও জনসংখ্যার অনুপাতে বিএনসিসি এই অঞ্চলের অন্যতম সংগঠিত ও কার্যকর ক্যাডেট বাহিনী। আগামী পর্বগুলোতে আমরা প্রতিটি দেশের ক্যাডেট কোর আলাদাভাবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব — ইতিহাস, কাঠামো, প্রশিক্ষণ, সার্টিফিকেট ও সুযোগ-সুবিধাসহ — এবং প্রতিবারই বিএনসিসির সাথে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য তুলে ধরব।

    পরবর্তী পর্ব (২য়): ভারত — National Cadet Corps (NCC): বিশ্বের বৃহত্তম যুব ক্যাডেট বাহিনীর বিস্তারিত পরিচিতি।

    তথ্যসূত্র


    ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত ও সম্পাদিত: ক্যাপ্টেন মুহম্মদ জিয়াউর রহমান, বিএনসিসি অফিসার। — https://bncc.work