জ্ঞান · শৃঙ্খলা · স্বেচ্ছাসেবক  •  Knowledge, Discipline, The Volunteers

সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ (পর্ব ২): ভারত — National Cadet Corps (NCC)

সার্ক ক্যাডেট কোর সিরিজ — পর্ব ২। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ও প্রাচীনতম যুব সামরিক প্রশিক্ষণ সংগঠন ভারতের ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (National Cadet Corps, সংক্ষেপে NCC)। এই পর্বে আমরা ভারতের এনসিসির ইতিহাস, সাংগঠনিক কাঠামো, লক্ষ্য, প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেট ব্যবস্থা তুলে ধরব এবং সবশেষে বাংলাদেশের বিএনসিসির সাথে তুলনামূলক পর্যালোচনা করব।

ভূমিকা ও ঐতিহাসিক পটভূমি

ভারতের ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (NCC) হলো দেশটির স্কুল ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গঠিত একটি স্বেচ্ছাসেবী, ত্রি-বাহিনী ভিত্তিক যুব সংগঠন। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ১৬ জুলাই ১৯৪৮ সালে, ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর অ্যাক্ট, ১৯৪৮ (NCC Act XXXI of 1948)-এর অধীনে। এর সদর দপ্তর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থিত।

এনসিসির শিকড় ব্রিটিশ আমলের কয়েকটি পূর্বসূরি সংগঠনের মধ্যে প্রোথিত। ১৯১৭ সালের ইন্ডিয়ান ডিফেন্স অ্যাক্টের অধীনে গঠিত হয় “ইউনিভার্সিটি কোর” (University Corps); ১৯২০ সালে এটি রূপান্তরিত হয় “ইউনিভার্সিটি ট্রেনিং কোর” (University Training Corps)-এ এবং ১৯৪২ সালে এর নামকরণ হয় “ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ট্রেনিং কোর” (University Officers Training Corps)। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে এইসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ১৯৪৮ সালে আধুনিক এনসিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে গার্লস ডিভিশন (Girls Division) এবং ১৯৫০ সালে বিমান শাখা (Air Wing) যুক্ত হয়ে সংগঠনটি পূর্ণাঙ্গ ত্রি-বাহিনী রূপ লাভ করে।

সাংগঠনিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়

ভারতের এনসিসি পরিচালিত হয় দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (Ministry of Defence) অধীনে। সংগঠনটির সর্বোচ্চ প্রধান হলেন মহাপরিচালক (Director General, DG), যিনি সাধারণত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (Lieutenant General) পদমর্যাদার একজন সামরিক কর্মকর্তা।

সংগঠনটি তিনটি বাহিনী-শাখা বা উইং নিয়ে গঠিত:

  • আর্মি উইং (Army Wing) — স্থল সেনাবাহিনী ভিত্তিক প্রশিক্ষণ;
  • নেভাল উইং (Naval Wing) — নৌবাহিনী ভিত্তিক প্রশিক্ষণ;
  • এয়ার উইং (Air Wing) — বিমান বাহিনী ভিত্তিক প্রশিক্ষণ।

দেশজুড়ে সমন্বয়ের জন্য রাজ্য ও অঞ্চলভিত্তিক ডিরেক্টরেট (State/Regional NCC Directorate) এবং তার অধীনে গ্রুপ হেডকোয়ার্টার ও ইউনিট রয়েছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম মূলত পরিচালনা করেন নিয়মিত বাহিনীর কর্মকর্তা এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকে কমিশনপ্রাপ্ত অ্যাসোসিয়েট এনসিসি অফিসার (Associate NCC Officer, ANO)গণ।

লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মূলমন্ত্র

ভারতের এনসিসির মূলমন্ত্র (Motto) হলো “একতা ও শৃঙ্খলা” (Unity and Discipline), যা আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় ১৯৮০ সালের ১২ অক্টোবর।

সংগঠনটির ঘোষিত তিনটি প্রধান লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হলো:

  1. দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে চরিত্র, সহমর্মিতা, সেবার আদর্শ ও নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে তোলা;
  2. যুবসমাজকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশরক্ষায় আগ্রহী ও উদ্বুদ্ধ করে তোলা;
  3. জাতীয় জরুরি অবস্থায় সশস্ত্র বাহিনীর দ্রুত সম্প্রসারণে সহায়ক একটি প্রশিক্ষিত রিজার্ভ (reserve) গড়ে তোলা।

উল্লেখ্য, এনসিসি সরাসরি সেনা নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয় না; বরং এটি নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও নাগরিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার একটি চরিত্রগঠনমূলক প্ল্যাটফর্ম।

ক্যাডেট সংখ্যা ও বিস্তৃতি

ভারতের এনসিসি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইউনিফর্মধারী যুব সংগঠন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী এর ক্যাডেট সংখ্যা আনুমানিক ১৭ লক্ষ থেকে ২৩ লক্ষ (প্রায় ১.৭–২.৩ মিলিয়ন)। এই বিপুল সংখ্যক ক্যাডেট সারা ভারতের হাজার হাজার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে আছে। ছেলে ও মেয়ে উভয়ই এই সংগঠনে অংশগ্রহণ করে এবং জুনিয়র (স্কুল পর্যায়) ও সিনিয়র (কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়) — উভয় ডিভিশনেই কার্যক্রম বিস্তৃত।

প্রশিক্ষণ, ক্যাম্প ও কার্যক্রম

এনসিসির প্রশিক্ষণ কার্যক্রম মূলত দুই ভাগে বিভক্ত — প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ (Institutional Training) এবং ক্যাম্প প্রশিক্ষণ (Camp Training)। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের আওতায় থাকে ড্রিল ও কুচকাওয়াজ, ম্যাপ রিডিং, ফিল্ডক্রাফট, অস্ত্র পরিচিতি ও ছোট অস্ত্রের ফায়ারিং, শারীরিক প্রশিক্ষণ, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং নেতৃত্ব বিকাশমূলক নানা কার্যক্রম।

ক্যাম্প প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে বার্ষিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প (Annual Training Camp, ATC), কম্বাইন্ড অ্যানুয়াল ট্রেনিং ক্যাম্প (CATC), নৌ ও বিমান শাখার বিশেষায়িত ক্যাম্প, ট্রেকিং ও অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্প প্রভৃতি। সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর একটি হলো প্রতি বছর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত রিপাবলিক ডে ক্যাম্প (Republic Day Camp, RDC), যেখানে সারা দেশ থেকে বাছাইকৃত ক্যাডেটরা অংশ নেয় এবং প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সেবা, বৃক্ষরোপণ, রক্তদান ও সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রমেও এনসিসি ক্যাডেটরা নিয়মিত অংশ নেয়।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এনসিসির উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি হলো ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম (Youth Exchange Programme, YEP), যার মাধ্যমে প্রতি বছর শতাধিক ক্যাডেট বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোতে বিনিময় সফরে যায়। এই তালিকায় সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, মরিশাস, ভিয়েতনাম, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, রাশিয়াসহ বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত — যা এই সিরিজের আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোচনার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।

র‍্যাঙ্ক, সার্টিফিকেট ও সুযোগ-সুবিধা

এনসিসিতে ক্যাডেটরা প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিভিন্ন র‍্যাঙ্ক অর্জন করে; সিনিয়র ডিভিশনে যেমন—ল্যান্স কর্পোরাল, কর্পোরাল, সার্জেন্ট, আন্ডার অফিসার ও সিনিয়র আন্ডার অফিসার। মূল্যায়ন ও সনদপ্রাপ্তির জন্য রয়েছে তিন স্তরের সার্টিফিকেট পরীক্ষা:

  • সার্টিফিকেট ‘এ’ (Certificate A): জুনিয়র ডিভিশন/উইং-এর ক্যাডেটদের জন্য (সাধারণত ৮ম–১০ম শ্রেণি); নির্দিষ্ট উপস্থিতি ও একটি বার্ষিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আবশ্যক।
  • সার্টিফিকেট ‘বি’ (Certificate B): সিনিয়র ডিভিশন/উইং-এর ক্যাডেটদের জন্য (দশম শ্রেণির পর); নির্দিষ্ট উপস্থিতি ও একটি বার্ষিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আবশ্যক।
  • সার্টিফিকেট ‘সি’ (Certificate C): সর্বোচ্চ স্তরের সনদ, সাধারণত প্রশিক্ষণের তৃতীয় বর্ষে অর্জিত হয়; এর জন্য একাধিক (সাধারণত দুটি) বার্ষিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প বা সমমানের বিশেষায়িত ক্যাম্প প্রয়োজন।

এই সার্টিফিকেটগুলো, বিশেষত ‘সি’ সার্টিফিকেট, ভারতে সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা ও অগ্রাধিকার এনে দেয়। এর পাশাপাশি ক্যাডেটরা নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা, শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস ও দেশপ্রেমের মতো আজীবন-উপযোগী গুণাবলি অর্জন করে।

বিএনসিসির সাথে তুলনা

বাংলাদেশের বিএনসিসি (Bangladesh National Cadet Corps) এবং ভারতের এনসিসি — উভয়েরই আদর্শগত ভিত্তি এক: ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেম গড়ে তোলা। উভয় সংগঠনই ত্রি-বাহিনী ভিত্তিক (সেনা, নৌ ও বিমান শাখা) এবং উভয়ই নিজ নিজ দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত। এমনকি দুই সংগঠনেরই পূর্বসূরি ছিল ব্রিটিশ আমলের ‘ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ট্রেনিং কোর’ ধারার সংগঠন — ফলে ঐতিহাসিক শিকড়ও অভিন্ন।

তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। ভারতের এনসিসি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালে, আর বিএনসিসি স্বাধীন বাংলাদেশে বর্তমান রূপে সংগঠিত হয় ১৯৭৯ সালের ২৩ মার্চ — যখন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ট্রেনিং কোর, বাংলাদেশ ক্যাডেট কোর ও জুনিয়র ক্যাডেট কোরকে একীভূত করেন। মূলমন্ত্রেও পার্থক্য স্পষ্ট: এনসিসির মূলমন্ত্র “একতা ও শৃঙ্খলা”, আর বিএনসিসির মূলমন্ত্র “জ্ঞান ও শৃঙ্খলা” এবং প্রাণসত্তা “দ্য ভলান্টিয়ার্স” (The Volunteers)।

সবচেয়ে বড় পার্থক্য পরিসরে। ভারতের বিশাল জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বিস্তৃতির কারণে এনসিসির ক্যাডেট সংখ্যা প্রায় ১৭–২৩ লক্ষ, যা বিএনসিসির তুলনায় বহুগুণ বেশি। তবে সংখ্যাগত এই পার্থক্য সত্ত্বেও প্রশিক্ষণের কাঠামো, ক্যাম্প ব্যবস্থা ও সার্টিফিকেট ধারণা (বি ও সি সার্টিফিকেট) উভয় দেশে অনেকটা সমান্তরাল। আঞ্চলিক সহযোগিতার দিক থেকেও দুই সংগঠন সংযুক্ত — ভারতের ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে বাংলাদেশ একটি অংশগ্রহণকারী দেশ।

তথ্যসূত্র

ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত ও সম্পাদিত: ক্যাপ্টেন মুহম্মদ জিয়াউর রহমান, বিএনসিসি অফিসার। — https://bncc.work

About The Author


Discover more from BNCC Resource Hub

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Comments

Leave a Reply

Discover more from BNCC Resource Hub

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Discover more from BNCC Resource Hub

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading