আগুন যেমন আমাদের পরম বন্ধু, তেমনি অসতর্কতায় তা হয়ে উঠতে পারে চরম শত্রু। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (BNCC)-এর কর্ণফুলী রেজিমেন্ট সর্বদা ক্যাডেটদের দক্ষ ও চৌকস করে গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি আয়োজিত হয়েছে ‘ফায়ার ফাইটিং ম্যানেজমেন্ট কোর্স’। একজন ক্যাডেট, শিক্ষার্থী বা সচেতন নাগরিক হিসেবে ২ ঘণ্টার এই প্রশিক্ষণ কোর্সে যা যা শেখানো হয়, তার একটি পূর্ণাঙ্গ সংকলন আজ আমরা তুলে ধরবো।
১. আগুন কী? (রসায়ন ও তত্ত্ব)
আগুনকে বুঝতে হলে আগে এর জন্মরহস্য বুঝতে হবে। অগ্নিনির্বাপণ বিজ্ঞানে একে Fire Triangle বা ‘অগ্নি ত্রিভুজ’ বলা হয়।

আগুনের জন্য তিনটি উপাদান অনিবার্য:
১. জ্বালানি (Fuel): কাঠ, গ্যাস বা তেল।
২. অক্সিজেন (Oxygen): যা বাতাস থেকে আসে।
৩. তাপ (Heat): যা জ্বলন শুরু করে।
এই তিনটির যেকোনো একটিকে সরিয়ে দিলেই আগুন নিভে যাবে। একে বলা হয় ‘Starvation’, ‘Smothering’ অথবা ‘Cooling’।
২. আগুনের শ্রেণিবিভাগ (Classes of Fire)
সব আগুন এক নয়, তাই নেভানোর পদ্ধতিও ভিন্ন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আগুনকে প্রধানত ৫টি ভাগে ভাগ করা হয়:
|
শ্রেণি |
আগুনের উৎস |
নির্বাপণ পদ্ধতি |
|
Class A |
কাঠ, কাগজ, কাপড় (সাধারণ দাহ্য পদার্থ) |
পানি বা সাধারণ অগ্নিনির্বাপক। |
|
Class B |
তেল, পেট্রোল, গ্রিজ (তরল দাহ্য পদার্থ) |
ফোম বা কার্বন ডাই-অক্সাইড। |
|
Class C |
গ্যাসীয় পদার্থ (মিথেন, এলপিজি) |
ড্রাই কেমিক্যাল পাউডার (DCP)। |
|
Class D |
দাহ্য ধাতু (ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম) |
বিশেষ পাউডার। |
|
Class E/F |
বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বা রান্নার তেল |
কার্বন ডাই-অক্সাইড বা ওয়েট কেমিক্যাল। |
৩. অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহারের সঠিক নিয়ম: PASS পদ্ধতি
প্রশিক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফায়ার এক্সটিংগুইশার বা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার করা। এটি মনে রাখার সহজ উপায় হলো PASS:
- P (Pull): যন্ত্রের সেফটি পিনটি টেনে খুলে ফেলুন।
- A (Aim): আগুনের শিখার দিকে নয়, বরং আগুনের গোঁড়ার দিকে লক্ষ্য করুন।
- S (Squeeze): হ্যান্ডেলটি জোরে চাপ দিন।
- S (Sweep): ডানে-বামে ঝাড়ু দেওয়ার মতো করে পাউডার বা গ্যাস স্প্রে করুন।
৪. ফায়ার ফাইটিং ম্যানেজমেন্ট: অ্যাডভান্সড ধাপ
প্রশিক্ষণ কোর্সে শুধু আগুন নেভানো নয়, বরং একটি দুর্ঘটনা কীভাবে সামলাতে হয় তা শেখানো হয়।
ক. উদ্ধার অভিযান (Rescue Operation)
আগুনে আটকা পড়লে ধোঁয়া থেকে বাঁচতে হবে। ধোঁয়া সবসময় উপরের দিকে ওঠে, তাই নিচে বাতাস পরিষ্কার থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে উদ্ধারের সময় ‘Crawl’ বা হামাগুড়ি দিয়ে বের হতে হবে।
খ. প্রাথমিক চিকিৎসা
আগুনে পুড়ে গেলে (Burn injury) প্রথম কাজ হলো অন্তত ১৫-২০ মিনিট সাধারণ তাপমাত্রার পানি ঢালা। কোনো অবস্থাতেই টুথপেস্ট বা বরফ লাগানো যাবে না।
গ. ইভাকুয়েশন প্ল্যান (Evacuation Plan)
যেকোনো ভবনে আগুনের সাইরেন বাজলে আতঙ্কিত না হয়ে ধীরস্থিরভাবে নিকটস্থ ‘ফায়ার এক্সিট’ দিয়ে বের হতে হবে। মনে রাখবেন, আগুনের সময় কখনোই লিফট ব্যবহার করা যাবে না।
৫. ব্যবহারিক সেশন: ২ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ মডিউল
কর্ণফুলী রেজিমেন্টের এই কোর্সে অংশগ্রহণকারীরা যা যা সরাসরি অনুশীলন করেন:
- প্রথম ৩০ মিনিট: তত্ত্বীয় আলোচনা এবং আগুনের ধরন চেনা।
- পরবর্তী ৩০ মিনিট: বিভিন্ন প্রকার এক্সটিংগুইশার (CO2, DCP, Foam) পরিচিতি।
- শেষ ৬০ মিনিট: নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আগুন জ্বালিয়ে তা সরাসরি নেভানোর অনুশীলন এবং উদ্ধার মহড়া।
৬. সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব ও তথ্যের উৎস
একটি অগ্নিকাণ্ড রোধে আমাদের ছোট ছোট পদক্ষেপ বড় ভূমিকা রাখে। রান্না শেষে গ্যাসের চুলা বন্ধ রাখা, বৈদ্যুতিক মাল্টিপ্লাগে অতিরিক্ত লোড না দেওয়া এবং নিয়মিত ফায়ার ড্রিল করা জরুরি।
উপসংহার
আগুন প্রতিরোধের জ্ঞান থাকা মানেই হলো জীবন বাঁচানোর সক্ষমতা অর্জন করা। কর্ণফুলী রেজিমেন্টের এই ফায়ার ফাইটিং ম্যানেজমেন্ট কোর্স আমাদের শুধু সাহসী ক্যাডেট নয়, বরং একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলেছে। মনে রাখবেন, “প্রশিক্ষণই শক্তি, প্রস্তুতিই মুক্তি।”
তথ্যের উৎস:
- বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর।
- ন্যাশনাল ফায়ার প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন (NFPA) হ্যান্ডবুক।
- কর্ণফুলী রেজিমেন্ট, বিএনসিসি-এর প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা।
About The Author
Discover more from BNCC Resource Hub
Subscribe to get the latest posts sent to your email.